রাজশাহী কলেজের পাঁচজন বিদগ্ধ শিক্ষক ও লেখকের সাহিত্যচর্চা ও কীর্তি

ড. আবু নোমান

সাহিত্য কেবল শব্দের শিল্প নয়; এটি মানুষের অন্তর্জীবনের দীর্ঘশ্বাস, সময়ের নীরব দলিল এবং সভ্যতার আত্মপ্রতিকৃতি| যুগে যুগে সাহিত্যই মানুষের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, ¯^প্ন-সংগ্রাম ও প্রতিবাদের গভীরতম অনুভূতিকে ভাষা দিয়েছে| কখনো কবিতার সুরেলা পঙক্তিতে, কখনো গল্পের রক্তমাংসের চরিত্রে, কখনো বা রম্যরচনার নির্মল হাস্যরসে মানুষের জীবনই ফিরে এসেছে শিল্পের রূপ ধরে| তাই সাহিত্যকে কেবল পাঠের বিষয় বললে ভুল হবে; সাহিত্য মূলত মানুষের আত্মাকে জানার, সময়কে অনুভব করার এবং জীবনের গভীরতম সত্যকে অনুধাবনের এক অনন্ত অভিযাত্রা|
বাংলা সাহিত্যের এই বহু¯^রিক ও বহুমাত্রিক ভুবনে প্রবেশ করলে পাঠক উপলব্ধি করতে পারেন, সাহিত্য আসলে মানুষের জীবন থেকেই জন্ম নেয় এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকেই নতুনভাবে আবিষ্কার করতে শেখায়| তাই এই আলোচনা শুধু কয়েকজন সাহিত্যিকের পরিচিতি নয়; এটি বাংলা সাহিত্যের সমকালীন সৃজনধারার অন্তর্লোক অšে^ষণেরও এক বিনম্র প্রয়াস|

আরো ‍পড়ুন

শিফন হাবিবের কাব্যভাবনা : অনুভূতির অন্তর্লোক ও নীরব বিষাদের নন্দনচেতনা
সমকালীন বাংলা কবিতায় শিফন হাবিব এক ¯^তন্ত্র ও মননশীল কণ্ঠ¯^র| রাজশাহী কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক তিনি| কবি হিসেবে পরিচিত হতে ভালই লাগে| তাঁর কবিতায় জীবনের গভীর অনুভব, অস্তিত্বের প্রশ্ন, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু, প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্জাগতিক সংকট এক বিশেষ নান্দনিকতায় প্রকাশিত হয়েছে| শিফন হাবিবের কবিতায় প্রথম যে বিষয়টি গভীরভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা হলো তাঁর অনুভবের ¯^াতন্ত্র্য| তিনি সরাসরি কোনো তত্ত্বের কবি নন; বরং মানুষের মনের অদৃশ্য কম্পন, নিঃশব্দ বেদনা এবং অন্তর্গত অস্থিরতাকে এক ধরনের দার্শনিক ও প্রতীকী ভাষায় প্রকাশ করেন| তাঁর কবিতায় ˆদনন্দিন জীবনের সাধারণ ঘটনাও হঠাৎ করে রহস্যময় ব্যঞ্জনায় দীপ্ত হয়ে ওঠে| তিনি দৃশ্যমান বাস্তবকে কেবল বর্ণনা করেন না, বরং অনুভূতির আলো-ছায়ায় তাকে নতুন অর্থ দান করেন|
কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ষোড়শী পঙক্তিমালা’ মূলত একটি বিশেষ গাণিতিক ও ˆশল্পিক কাঠামোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত| এই কাব্যের নামভূমিকায় থাকা কবিতাগুলোর প্রতিটিই ১৬ পঙক্তিতে লিখিত এবং দুটি সুনির্দিষ্ট ভাগে বিভক্ত| প্রতিটি কবিতা কাঠামোগতভাবে সীমাবদ্ধ হলেও ভাবনার দিক থেকে এক একটি ¯^য়ংসম্পূর্ণ জগত| কবির অবিচল প্রেম, জীবনের জটিল বাস্তবতা, মনস্তাত্ত্বিক দ্রোহ এবং গভীর জীবনবোধই এই কাব্যগ্রন্থের মূল উপজীব্য বিষয়|
‘আগুন ছুঁই না আমি’ কবিতাটি মূলত এক তীব্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতীকী রূপায়ণ| এখানে রোদে পুড়ে 'সোনার অধরের' লাবণ্য হারানোর ভয় থাকা সত্ত্বেও এক গ্রামীণ বা শহরতলীর শ্রমজীবী নারীর বেঁচে থাকার আকুল সংগ্রাম চিত্রিত হয়েছে| রাতের তীব্র শীত আর ঘরে ভাতের অভাবের মাঝেও সে এক অদ্ভুত আত্মমর্যাদা ধরে রাখে| ঘরে তীব্র অভাব কিন্তু সে কোনো ভুল পথে পা বাড়াতে চায় না, যাকে কবি 'আগুন' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন| কবিতার শেষাংশে নারীর সেই অমোঘ আত্মোপলব্ধি ফুটে ওঠে এভাবে, ‘কাপড়ে লজ্জা যায়, যায় না দুঃখ; কাপড় কখনো / ভণ্ডের চেলা! আগুনের কথা বোলো না তুমি! চুপ করো, / পুলিশ আসবে! জানো না তুমি, আগুন ভীষণ ছোঁয়াচে জিনিস? / একবার যদি জ্বালাই আগুন ঘরের ভেতর, / জ্বলতে থাকবে সারা বছর! পুড়িয়ে দেবে তা সবার বস্ত্রসকল, / বাড়িঘর, সাজানো বাসর, সমস্ত সংসার| / আগুন ছুঁই না আমি, ভরা দুপুরে শুধু রোদ পোহাই|’ (ষোড়শী পঙক্তিমালা, আগুন ছুঁই না আমি, পৃ. ১৩)| কবি এখানে 'আগুন' শব্দটিকে একাধারে ধ্বংসাত্মক প্রলোভন ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষোভের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা একবার ঘরে ঢুকলে পুরো সংসারকে ছারখার করে দিতে পারে| তাই শত কষ্টেও রোদ পোহানো শ্রেয়, কিন্তু আগুন ছোঁয়া নয়|
শিফন হাবিবের কবিতার একটি অন্যতম বড় শক্তি হলো চরম ˆনরাশ্যের মাঝেও বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত আদিম জিদকে আবিষ্কার করা| সমাজে বা জনপদে যখন তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা অভাবের হাহাকার নেমে আসে, তখনও তাঁর কবিতার চরিত্ররা ভুল পথে পা না বাড়িয়ে এক আশ্চর্য আত্মমর্যাদা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যায়| কবি এখানে মানুষের ভেতরের সেই দাহ ও জেদকে আগুনের সাথে তুলনা করেন, যা একবার ঘরে ঢুকলে সব ধ্বংস করে দিতে পারে, তাই কপালে শত কষ্ট জুটলেও ¯^াভাবিক জীবনসংগ্রামের রোদ্দুর পোহানোই শ্রেয় বলে তিনি মনে করেন| আবার জীবনের চরম সত্য যে জন্ম ও মৃত্যুর অলঙ্ঘনীয় চক্র, তাকেও কবি দেখেছেন এক পরম নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে| অবধারিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সৃষ্টির এই যে প্রেমের দিকে ধাবিত হওয়া, ক্ষণভঙ্গুর শরীরের ¯^াদ পেরিয়ে অবিনশ্বর অনুভূতির ফাঁদে জড়ানো, তাকেই তিনি জীবনের আসল সার্থকতা বা পরম ‘যোগ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন|
একই সাথে, সমাজ ও সভ্যতার প্রতি কবির যে পর্যবেক্ষণ, তা অত্যন্ত প্রখর এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা এক দ্রোহী চেতনার আগুনে রূপ নেয়| ক্ষমতার দম্ভ, চাটুকারিতা আর মেরুদণ্ডহীন তোষামোদকারী নগরীর প্রতি কবির রয়েছে এক চরম অস্তিত্ববাদী প্রত্যাখ্যান| ধূর্ত বাতাস আর অন্ধ শাসকের এই অবরুদ্ধ ও শ্বাসরোধী সময়ে যখন চারদিকে ˆনতিক স্খলনের মূষিক উৎপাত চলে, তখন কবি তাঁর কাঙ্ক্ষিত সত্তাকে আহ্বান জানান সমস্ত আদর্শ ও মানবিকতাকে শক্ত করে ধরে রাখার| ইতিহাসের পাতা থেকে ˆতমুর লং-এর বাগদাদ ধ্বংসের রূপক টেনে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, উৎপীড়ক ও ধ্বংসকারীরা ইতিহাসে কেবল ঘৃণার পাত্র হয়েই বেঁচে থাকে, কিন্তু শাসকের হাতে দগ্ধ হওয়া শিল্পী ও তার অবিনশ্বর শিল্পই শেষ পর্যন্ত কালজয়ী হয়ে টিকে থাকে| মানুষের ˆতরি এই আধুনিক সভ্যতা যখন যান্ত্রিক শূন্যতার দিকে ধাবিত হয়, কি¤^া ˆবশ্বিক মহামারি ও অনাচারের পোড়ামাটির ঘরে আতঙ্ক ছড়ায়, তখন কবির কলম থেকে বেরিয়ে আসে এক অধিকার সচেতন শোষিত মানুষের চিরন্তন ও বেহায়া তোলপাড় তোলা গর্জন|
পরিশেষে বলা যায়, শিফন হাবিবের কাব্যভাবনা কেবল অন্ধকারের কোলাহল, স্মৃতির ক্ষয়রোগ কিংবা চিরন্তন বিষাদেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে না; তিনি ধ্বংস এবং বিষপান করা সক্রেটিসের হেমলকের শেষ প্রান্তেও দাঁড়িয়ে এক নতুন রূপান্তর, মুক্তি এবং মিষ্টি গন্ধে ভরা নতুন অধ্যায়ের ¯^প্ন দেখেন| সমকালীন সমাজ ও সময়ের অবক্ষয়কে শব্দের নিপুণ বুননে ধারণ করে সর্বজনীন উপাখ্যান রচনার এই যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তা-ই শিফন হাবিবকে সমকালীন বাংলা কবিতার আঙিনায় অনিবার্য আসনে অভিষিক্ত করেছে|

সাম্যসাথী ভৌমিকের কাব্যপ্রতিভা ও দর্শন
কবিতা কখনো বুলেটের চেয়েও লক্ষ্যভেদী, অশুভ মানবাত্মার বিরুদ্ধে তীক্ষ্ম বাক্যবান| কবি সাম্যসাথী ভৌমিকের কবিতাগ্রন্থ “সুপ্রভাত, জীবিত লোক” এর ক্ল্যাপসে কবিতা এভাবেই সংজ্ঞায়িত হয়েছে| কবি ভৌমিক ˆশশবে কবিতা পড়েছেন, দু-একটি লিখেছেনও, মাইকেল মধুসুদন, রবীন্দ্র, নজরুল, ফররুখ, জীবনানন্দ, সুকান্ত কোনোটাই বাদ দিতেন না, কিন্তু কবি হবার বাসনা মনে জাগেনি তখনো| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স-মাস্টার্স পড়ার সময়ে বাংলা সাহিত্য ছাড়াও বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় দৌড়িয়েছেন কবি| কখনো ছাত্রত্বের প্রয়োজনে কখনো ভালোলাগায়, পড়েছেন শেক&সপিয়ার, জন কিটস, বায়রন, জন মিলটন, জর্জ বার্নাড শ কোনো কিছুই তো বাদ যেতো না, কবিতা লেখার আগ্রহ তখন মনে উঁকি দিয়েছে হয়তো, সেভাবে নাড়া দিয়ে ওঠেনি| শিল্পকলা একাডেমি থেকে ২০১০ সালে প্রকাশিত বাউল সঙ্গীত গ্রন্থে তিনি লালনের ২৫টি গান ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন| রাজশাহী কলেজে অধ্যাপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সহস্র শিক্ষার্থীদের মাঝে কবিতা আওড়িয়েছেন একান্ত ভালোলাগা অনুভব থেকে| স্ত্রী ও তিনি দুজনেই সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য এবং অধাপক হিসেবে রাজশাহী কলেজে কর্মরত| স্ত্রী দেবযানী চক্রবর্তীও সাহিত্য সমোঝদার ও আগ্রহী পাঠক| ফলে বাসায় শিল্পচর্চার আবহ প্রবাহিত| 
মহামারী করোনার আবর্তে বিশ্ব যখন থমকে দাঁড়িয়েছিল, পৃথিবীর মানুষ যখন অসহায়-আর্ত হয়ে আকাশের দিকে সাহায্যের গ্রীবা উঁচু করে চাতক পাখির মত নিভৃত সাহায্যপ্রার্থী, এমনই এক বৃষ্টির রাতে কেন যেন জেগে ওঠে প্রাণ ঠিক রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের ¯^প্নভঙ্গের মত| কবি ভৌমিক বিছানা ছেড়ে পড়ার টেবিলে খাতা-কলম নিয়ে বসে গেলেন, কবিতা লিখলেন| সে-ই শুরু| অল্প কিছুুদিনে বেশ কিছু সুন্দর কবিতা লিখে তিনটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ করেন| বর্তমানে তিনি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী| কথা বলার ক্ষমতা তিনি হারালেও কবিতার সাথে তিনি রয়ে গেছেন| শব্দহীন ভাষার পাঠ করেন তাঁরই মেয়ে আকাশলীনা| অসুস্থ অবস্থায়ও তাঁর আরেকটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়| তাঁর এই কবিতাগ্রন্থের নাম শরশয্যা| কবিতার প্রথম প্রকাশিত সুপ্রভাত, জীবিত লোক গ্রন্থের প্রথম নামকবিতায় তিনি লিখলেন, “সকালে সূর্যাস্তের যাত্রা হলো শুরু /অনুপম রাত্রির প্রতীক্ষায়;.../ মানুষের অবয়বে অমাবশ্যার প্রতিসরণ/অন্ধ রশ্মিগুলো ছুঁয়েছে হৃদয়|/শূণ্যতাই পেয়েছে নিরঙ্কুশ বিজয়|” (সুপ্রভাত, জীবিত লোক, পৃ. ১১)
‘কফিন-বাহক’ কবিতায় ‘সরীসৃপের দুঃখ’ বলতে কবি যে অবশ হয়ে যাওয়া অসাড় শরীরের মনস্তত্ত্বকে বুঝিয়েছেন (মোটর নিউরন রোগের কারণে শরীর সরীসৃপের মতো অবশ হয়ে পড়ে), সেই ক্লিনিক্যাল ও কাব্যিক সংযোগের কথা এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আরও একটু বড় করা যেত| আইসিইউ-র নীরবতা কীভাবে কবির কবিতায় ‘শব্দহীন ভাষায়’ রূপান্তরিত হলো, সেই টেকনিক্যাল বিশ্লেষণটি আরেকটু গভীর হতে পারত|
কবি সাম্যসাথী ভৌমিক প্রচলিত ছকের কোনো কবি নন; তিনি শব্দ দিয়ে জীবনের পরম সত্য আর হৃদয়ের ক্ষতকে ছুঁয়ে দেওয়া এক অনন্য জাদুকর| রাজশাহী কলেজের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় যাঁর বিচরণ, করোনাকালের এক বৃষ্টিস্নাত রাতে রবীন্দ্রনাথের 'নির্ঝরের ¯^প্নভঙ্গ'-এর মতো তাঁর ভেতরের সেই সুপ্ত কবিসত্তা আকস্মিক জেগে ওঠে| 'সুপ্রভাত, জীবিত লোক' থেকে শুরু করে 'আমরা সর্বনাম' এবং সর্বশেষ 'সর্বংসহা' কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি পঙি&ক্ততে তিনি আধুনিক জীবনের ক্লান্তি, অবক্ষয় আর সমাজের নির্মম মুখোশকে শাণিত ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন|
তাঁর নামকবিতা 'সর্বংসহা'-র সেই অগ্নিগর্ভ ˆবপ্লবিক দ্রোহ ও হাহাকার এবং গ্রন্থের সর্বশেষ কবিতা 'সাধারণ'-এর সেই মেঠো সুবাস মাখানো মায়াবী প্রেম ও পরম মানবিকতা, এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে তাঁর সৃষ্টিতে| আজ এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে কবি শারীরিকভাবে বাকরুদ্ধ হলেও, তাঁর এই শব্দহীন গভীর ভাষা আজ কন্যা আকাশলীনার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে পাঠকের হৃদয়ে অনুরণিত হচ্ছে| 'শিরোনামহীন' কবিতার সেই আপসহীন অহংকারহীনতা কিংবা 'বেওয়ারিশ' কবিতার বুকফাটা আর্তনাদকে ছাপিয়ে দিনশেষে কবির দর্শন আমাদের এক অনিন্দ্যসুন্দর ভালোবাসার ব্রহ্মাণ্ডে নিয়ে যায়| এখানে জগতের সমস্ত মেকি আভিজাত্য একজোড়া সাধারণ চোখের 'সর্বনামে' এসে ¯ে^চ্ছায় পরাজয় ¯^ীকার করে| কণ্ঠ সাময়িক স্তব্ধ হতে পারে, কিন্তু 'সর্বংসহা'র স্রষ্টা কবি সাম্যসাথী ভৌমিকের এই কালজয়ী দর্শন আর দ্রোহের আগুন বাংলা সাহিত্যের আকাশে দীর্ঘকাল প্রজ্জ্বলিত থাকবে|

নাহিদা আফরোজ ও তাঁর কাব্যকীর্তি
দূর্বোধ্যতা যখন বাংলা কবিতার প্রবণতা, নাহিদা আফরোজ তখন একটি অনন্য ব্যতিক্রম ¯^র| দুর্দান্ত ব্যস্তজীবনের অনবরত পথচলায় হঠাৎ নিজেকে তাঁর আবিষ্কার| ছেলেবেলায় হয়তো কবিতা দেখা দিয়েছিলো মননে আনমনে, তার সার্থক প্রথম প্রকাশটিও সুদূর অতীত নয়| তারপর মুষলধারে বৃষ্টিপাত, যেন শিলাবৃষ্টি, অনবরত বৃষ্টির গান| পরপর অনেকগুলো কবিতা লিখে ফেসবুকে, ব্লগে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন বন্ধু ও পাঠকমহলে| আগ্রহী আবৃতিকার বাচিকশিল্পীগণের তাড়ায় আরো আরো লিখার তাগিদকে অ¯^ীকার করতে পারেন না তিনি| কবির অনেক কবিতাই এখন ইউটিউবে বন্ধু বাচিকশিল্পীদের কণ্ঠে ঘুরে ফিরে| 
কবির জন্ম চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় সমুদ্রপাড়ে| চট্টগ্রামের খাস্তগীর সরকারি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সমুদ্রের লোনা বাতাসের সুগন্ধমাখা সৌরভে প্রথম মুগ্ধ হন কবি| সেখানেই বেড়ে ওঠা| তাঁর কবিতা প্রেম-প্রণয় আর ভালোবাসার রোমন্থনে এমন এক ধরনের রোমাঞ্চকর পরিবেশ ˆতরি করে যা পাঠককে নিয়ে যায় স্মৃতির ¯^দেশে| বাবা ছিলেন প্রকৌশলী, বদলীজণিত কারণে সারা বাংলাদেশেই ঘুরেফিরে বেড়িয়েছেন তিনি| আর তিনি চব্বিশ বিসিএিস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য, রাজশাহী কলেজে অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক| 
পরিশেষে বলা যায়, বাংলা কবিতার চিরাচরিত দুর্বোধ্যতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নাহিদা আফরোজ এক অত্যন্ত প্রাঞ্জল, অথচ গভীর জীবনমুখী কাব্যভাষার জন্ম দিয়েছেন| তাঁর কবিতা কেবল শব্দের অলংকার নয়, বরং তা জীবনযাপনের এক নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক প্রতিচ্ছবি| পেশাগত জীবনে অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক হয়েও তিনি যেভাবে হৃদয়ের জটিল সমীকরণগুলোকে কবিতার চরণে রূপান্তর করেছেন, তা এককথায় অনন্য|
তাঁর ক্যানভাসে যেমন স্থান পেয়েছে রাঁধা-বাড়ার আড়ালে মধ্যবিত্ত নারীর 'সৃজনশীল সত্তা'র অলক্ষিত মৃত্যু কিংবা করোনাকালের চরম ˆবশ্বিক অনিশ্চয়তা; তেমনি ফুটে উঠেছে প্রেম, বিরহ, আদিম উদ্দীপনা এবং সমাজের বর্ণবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধে এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক দ্রোহ| পিতার স্মৃতিবিজড়িত 'বাবার সোনালি চশমা' কিংবা না-মাখা ফেয়ারনেস ক্রিমের কৌটার রূপকে তিনি সামাজিক নীচতার যে ক্ষতকে উন্মোচিত করেছেন, তা পাঠককে এক দীর্ঘস্থায়ী আত্মানুসন্ধানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়|
নাহিদা আফরোজের কবিতা চড়া সুরে চিৎকার করে না, বরং বরফের মতো শীতল ও ধারালো হয়ে পাঠকের মস্তিস্ক ও হৃদয়ে প্রবেশ করে| আবৃত্তিশিল্পী থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠক—সবার মাঝে তাঁর এই বিপুল জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে, তিনি জনবিচ্ছিন্ন কোনো কবি নন; বরং মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের সুখ-দুঃখের এক সংবেদনশীল রূপকার| সুর, রঙ, মায়াবী নস্টালজিয়া এবং গভীর জীবনদর্শনের যুগলবন্দীতে নাহিদা আফরোজের কাব্যকীর্তি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় নিঃসন্দেহে এক দীর্ঘস্থায়ী ও গৌরবময় আসন লাভ করেছে|

হাজেরা খাতুন: সময়ের অনন্য গল্পকার
বাংলা কথাসাহিত্যে গ্রামীণ জীবন, সমাজবাস্তবতা ও মানুষের অন্তর্গত বেদনার শিল্পরূপ নির্মাণে হাজেরা খাতুন এক অনন্য নাম| রাজশাহী কলেজে বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন| গল্প ও কবিতা লেখেন| তাঁর গল্পে যেমন মাটির গন্ধ আছে, তেমনি আছে সময়ের ক্ষতচিহ্ন| মানুষের জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য, সামাজিক ˆবষম্য, অবহেলা ও প্রতিবাদের ভাষা তাঁর কলমে হয়ে উঠেছে গভীর মানবিকতার দলিল| তাঁর দুইটি উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ’, কুঁচকড়ি এবং কাঁটাবনে লাল শিউলি বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যে ভিন্নমাত্রার সংযোজন| প্রথম গ্রন্থে’ তিনি গ্রামীণ জীবনের চিরায়ত সুখ-দুঃখ ও মানবিক সম্পর্কের কথা বলেছেন, আর দ্বিতীয় গ্রন্থে উঠে এসেছে সময়ের প্রতিবাদ, রক্তাক্ত ইতিহাস ও মানুষের আত্মত্যাগের বেদনাময় কাহিনি|
প্রথম গল্পগ্রন্থ’ কুঁচকড়ি মূলত গ্রামীণ সমাজজীবনের বাস্তব চিত্র নিয়ে রচিত| এ গ্রন্থের গল্পগুলো পড়লে মনে হয় যেন বাংলার কোনো অজপাড়াগাঁয়ের মেঠোপথ ধরে আমরা হাঁটছি| চারদিকে ধানের গন্ধ, কাঁচা মাটির ঘ্রাণ আর সাধারণ মানুষের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস| গল্পকার অত্যন্ত সহজ অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষায় গ্রামীণ মানুষের জীবনসংগ্রামকে তুলে ধরেছেন| গল্পের চরিত্রগুলো কাল্পনিক নয়; আমাদের সমাজের চেনা মানুষ তারা, অভাবের সঙ্গে লড়াই করা কৃষক, অবহেলিত বৃদ্ধ, ¯^প্নভঙ্গের বেদনায় ক্লান্ত নারী কিংবা বেঁচে থাকার সংগ্রামে অবিচল মানুষ|
প্রথম গল্পগ্রন্থের নামগল্প কুঁচকড়িতে একটি সামান্য লাল ফলকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জীবনের আবহ নির্মাণ করা হয়েছে| ছোট্ট ফলটির মতোই ছোট ছোট মানুষের জীবন, অথচ সেই জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গভীর অনুভব ও ¯^প্নের আলো| গল্পকারের বর্ণনায় গ্রামের প্রকৃতি, মানুষের সহজ-সরল সম্পর্ক ও লোকজ সংস্কৃতি যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে|
অন্যদিকে “লবডঙ্কা” গল্পে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষকের অসহায় জীবনযাপন পাঠকের হৃদয়কে ব্যথিত করে| কর্মজীবনে সম্মানিত হলেও অবসরের পরে পরিবার ও সমাজের কাছে তাঁর অবস্থান হয়ে ওঠে করুণ| স্ত্রী ও সন্তানদের অবহেলা, দারিদ্র্য ও মানসিক নিঃসঙ্গতা তাঁকে শেষ পর্যন্ত এক অজানা পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়| এই গল্প কেবল একজন মানুষের নয়; এটি আমাদের সমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি|
কুঁচকড়ি এবং জুলাইয়ের জবাকুসুম এই দুই গ্রন্তের মধ্য দিয়ে হাজেরা খাতুনের সাহিত্যিক সত্তার দুইটি ভিন্ন রূপ প্রকাশিত হয়েছে| “কুঁচকড়ি”-তে তিনি গ্রামীণ জীবনের সহজ সৌন্দর্য, দুঃখ ও মানবিক সম্পর্কের কথা বলেছেন; আর “কাঁটাবনে লাল শিউলি”-গ্রন্থে তিনি সময়ের অন্যায়, রক্তাক্ত বাস্তবতা ও প্রতিবাদের ইতিহাসকে ধারণ করেছেন| কিন্তু দুই গ্রন্থের মূল সুর একটিই, মানুষ এবং মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ|
হাজেরা খাতুন কেবল বিষয়ীগত দিক থেকেই সফল নন, ফিকশনের বিনির্মাণ-কৌশল ও আঙ্গিক চেতনাতেও অনন্য| তাঁর গল্পগুলোতে সরল ˆরখিক কাঠামোর চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক ফ্লাশব্যাক ও ¯^গতোক্তির ব্যবহার বেশি লক্ষ্য করা যায়| ‘শামসুজ্জোহা’ গল্পের নামকরণ ও চরিত্র হিসেবে আবু সাঈদের উপস্থিতি মূলত ১৯৬৯ ও ২০২৪-এর দুই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাঙালির দ্রোহের ধারাবাহিকতার এক অসাধারণ রূপক সংযোগ| তবে তাঁর চরিত্রগুলো তীব্র বাহ্যিক সংকটে দীপ্ত হলেও তাদের নিজ¯^ কোনো মনস্তাত্ত্বিক দোলাচল বা নেতিবাচক স্খলন নেই, ফলে চরিত্রগুলো কখনো কখনো রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে আদর্শবাদী প্রতীকে রূপ নেয়| বাংলা ছোটগল্পে তারাশঙ্কর বা মানিকের সমাজ-বাস্তবতার যে নিরাসক্ত ময়নাতদন্ত আমরা দেখি, হাজেরা খাতুন সেখানে যুক্ত করেছেন এক নিবিড় আত্মিক সংবেদনশীলতা| ফলে তাঁর গল্প ইতিহাস হয়েও শেষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ কথাসাহিত্য|
সবশেষে বলা যায়, হাজেরা খাতুন-এর গল্প কেবল পাঠের আনন্দ দেয় না; বরং মানুষকে ভাবায়, কাঁদায় এবং সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়| তাঁর সাহিত্য মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের জীবন থেকে উৎসারিত বলেই তা হৃদয় ছুঁয়ে যায়| বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যে তিনি মানবিকতা, সমাজবাস্তবতা ও প্রতিবাদের যে সম্মিলিত ধারা নির্মাণ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার|

অসাধারণ রম্যগল্প নির্মাতা রবিউল ইসলাম
রবিউল ইসলাম সমকালীন বাংলা সাহিত্যের একজন ¯^তন্ত্রধর্মী রম্যগল্পকার, গবেষক ও শিক্ষক| সাহিত্যচর্চার শুরু হয়েছিল তাঁর কবিতা দিয়ে| ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন রসিক ও আড্ডাপ্রিয়; মানুষের হাসি, জীবনের ছোটখাটো ঘটনা এবং ˆদনন্দিন অভিজ্ঞতার ভেতর তিনি খুঁজে পেয়েছেন সাহিত্যের প্রাণ| বিশেষত শিবরাম চক্রবর্তীর রম্যরচনার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁর লেখার ভঙ্গি ও রসবোধকে করেছে সমৃদ্ধ| ধীরে ধীরে তিনি গল্পের জগতে প্রবেশ করেন এবং রম্যগল্প রচনায় নিজ¯^ ¯^র নির্মাণ করেন|
১৯৭৭ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী শিবরামপুর গ্রামে তাঁর জন্ম| রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উ”চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন| তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল আবদুশ শাকুরের সাহিত্য : বিষয়বিন্যাস ও নির্মাণকৌশল| সাহিত্য-গবেষণার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন| বর্তমানে তিনি রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত| এর আগে রাজশাহী কলেজ, বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ, বদলগাছী এবং ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজে শিক্ষকতা করেছেন|
রবিউল ইসলামের সাহিত্যকর্মে সহজ ভাষা, সূক্ষ্ম হাস্যরস, মানবিক অনুভূতি এবং জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার চমৎকার মেলবন্ধন দেখা যায়| তাঁর গল্পে গ্রামীণ জীবন, শিক্ষাজীবনের মজার স্মৃতি, মানুষের আচরণ ও সামাজিক বাস্তবতা অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে ফুটে ওঠে| পাঠক তাঁর লেখায় যেমন হাসির রস খুঁজে পান, তেমনি খুঁজে পান গভীর মানবিকতা|
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রš’গুলোর মধ্যে রয়েছে রম্যগল্পগ্রন্থ’ কই মাছটি এখনও নড়ছে (২০১৯), বিরুদ্ধ বাতাসে বালক (২০২০) এবং জানালায় দেখা হলদে পরী (২০২৩)| শিশুসাহিত্যে তাঁর সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে চেরাগ আলীর ফুটবল কাল (২০২০)| এছাড়া গবেষণাগ্রš’ আবদুশ শাকুরের সাহিত্য : বিষয়বিন্যাস ও নির্মাণকৌশল এবং যৌথভাবে রচিত সাহিত্য তত্ত্বকথা তাঁর বিদ্যাচর্চার সাক্ষ্য বহন করে| সাহিত্য ও শিক্ষার জগতে রবিউল ইসলাম এক আন্তরিক, প্রাণময় ও সৃজননিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজ¯^ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ˆতরি করেছেন|
তাঁর তিনটি গ্রন্থই আসলে মানুষের চিরন্তন মানবিকতা, ভালোবাসা, নিঃসঙ্গতা, প্রতিবাদ ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে এক সমৃদ্ধ ও ˆবচিত্র্যময় জগৎ নির্মাণ করেছে| যাপিত জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে এমন মধুর ও রসাত্মক উপলব্ধির ভেতর দিয়ে প্রকাশ করার এই সার্থক প্রয়াসের কারণেই লেখক রবিউল ইসলাম সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের আঙিনায় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও অপরিহার্য আসন লাভ করেছেন|
সবশেষে বলা যায়, সাহিত্য মানুষের আত্মার গভীরতম অনুরণনের নাম| সময় বদলায়, সমাজের রূপান্তর ঘটে, মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে যায়; কিন্তু সাহিত্য তার শিল্পিত শক্তিতে যুগের অনুভূতি, মানুষের ¯^প্ন, বেদনা ও বোধকে ধারণ করে চিরকাল বেঁচে থাকে| একজন প্রকৃত সাহিত্যিক তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শুধু ভাষার সৌন্দর্য নির্মাণ করেন না; তিনি মানুষের অন্তর্জগত, সমাজের নীরব সংকট এবং জীবনের সূক্ষ্ম সত্যগুলোকেও উন্মোচিত করেন| এই আলোচনায় উল্লিখিত সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকর্ম সেই অর্থেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| তাঁদের কবিতা, গল্প ও রম্যরচনায় সমকালীন জীবনের বহুমাত্রিক রূপ যেমন ধরা পড়েছে, তেমনি ধরা পড়েছে মানুষের চিরন্তন মানবিকতা, ভালোবাসা, নিঃসঙ্গতা, প্রতিবাদ ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা| শিফন হাবীবের নীরব বিষাদমাখা কাব্যভুবন, সাম্যসাথী ভৌমিকের জীবনদর্শননির্ভর কাব্যচেতনা, নাহিদা আফরোজের আবেগঘন প্রেম ও সময়বোধ, হাজেরা খাতুনের সমাজবাস্তবতার গভীর মানবিক গল্প কিংবা রবিউল ইসলামের নির্মল হাস্যরসে ভরা রম্যরচনা সব মিলিয়ে এঁদের সাহিত্যকর্ম সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ও ˆবচিত্র্যময় জগত নির্মাণ করেছে| বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, তাঁদের প্রত্যেকের সাহিত্যচর্চার ভেতরে রয়েছে মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং জীবনের প্রতি আন্তরিক দায়বদ্ধতা| তাঁদের রচনায় কৃত্রিমতা নেই; আছে জীবনের কাছাকাছি থাকার সত্যনিষ্ঠ প্রয়াস| ফলে তাঁদের সাহিত্য পাঠককে শুধু নান্দনিক আনন্দই দেয় না, বরং ভাবায়, আলোড়িত করে এবং আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করায়| সাহিত্য তখন নিছক বিনোদন হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে মানবিক চেতনার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা| সমকালীন বাংলা সাহিত্যের প্রবহমান ধারায় এই সাহিত্যিকদের অবদান তাই নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ| তাঁদের সৃষ্টিকর্ম বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি আগামী প্রজন্মের সাহিত্যসাধকদের জন্যও রেখে গেছে অনুপ্রেরণার দীপ্ত দৃষ্টান্ত| সময়ের আবর্তে বহু কিছুই হয়তো হারিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের গভীর অনুভূতি থেকে উৎসারিত সত্যিকারের সাহিত্য কখনো বিলীন হয় না| কারণ সাহিত্য শেষ পর্যন্ত মানুষেরই কথা বলে, বলে মানুষের ¯^প্ন, মানুষের বেদনা এবং মানুষের অমর হয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষার কথা|

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url