মুঘল আমলে ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা
ভূমিকা ও মূল প্রেক্ষাপট (Introduction & Contextual Background)
ভূমি
মানব সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকেই সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে
আসছে। মানুষের জীবন ও জীবিকা কেবল ভূমির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং ভূমির সর্বোত্তম ও পরিকল্পিত
ব্যবহারের ওপর একটি সমাজের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও সমৃদ্ধি নির্ভর করে। ভূমি যেমন কোনো
নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি রচনা করে, তেমনি ভূমির ওপর রাষ্ট্রের
সার্বভৌম ও প্রশাসনিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয় ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে। প্রাচীনকাল
থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এ ভারতীয় উপমহাদেশে রাজস্ব ব্যবস্থা অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক
প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে।
প্রথম
অধ্যায়: ইসলামপূর্ব প্রাচীন ভারতের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা
ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত
ঐতিহাসিক বিতর্ক
মৌর্য
যুগে ভূমির শ্রেণিবিভাগ
সীতা
জমি (রাজার খাস জমি):
সমষ্টিগত
বা যৌথ মালিকানাধীন জমি:
দ্বিতীয়
অধ্যায়: মুঘল আমলের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা ও প্রশাসন
আকবরের
রাজস্ব সংস্কার ও টোডরমলের অবদান
কর
এলাকা গঠন ও ক্লোরি প্রথা (১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দ)
জমি
জরিপ প্রথা (পাইমাইশ ও জাবীর)
ভূমির
শ্রেণিবিভাগ ও রাজস্ব হার
কর
নির্ধারণ পদ্ধতিসমূহ
দশশালা
বন্দোবস্ত ও তাকাভি ঋণ
বিশেষ
ভূমিস্বত্ব (আলফে) ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা
তৃতীয়
অধ্যায়: ব্রিটিশ আমল থেকে আধুনিক বাংলাদেশের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার বিবর্তন
চিরস্থায়ী
বন্দোবস্ত ও জমিদারি প্রথা (১৭৯৩–১৯৫০)
স্বাধীন
বাংলাদেশের ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা
তৃণমূল
ভূমি অফিসের অবস্থা ও ডিজিটালাইজেশন
ভূমি ব্যবহার ও কর পরিশোধের
আবশ্যকীয় নিয়মকানুন (Rules and Guidelines)
কৃষিজমি কর মওকুফ সুবিধা:
বাণিজ্যিক ও বিশেষ কৃষি
খামারের কর নিয়ম:
অকৃষি ও বাণিজ্যিক ভূমির
কর নিয়ম:
নামজারি বা মিউটেশন
(Mutation):
সময়মতো কর পরিশোধ ও অনলাইন
সেবার ব্যবহার:
উপসংহার
(Conclusion)
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজস্ব আদায়ের প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তায় বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কার সাধিত হয়েছে। যেমন—শেরশাহের আমলে পরগনা ব্যবস্থা, মুঘল আমলে সুবেদারি প্রথা এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর ১৭৭২ সালে জেলা কালেক্টরের পদের সৃষ্টি। ভূমি ও ভূমিরাজস্ব আদায় ব্যবস্থাপনাকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে যুগে যুগে নানা আইন-কানুন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব নিয়মের কিছু প্রজার জন্য স্বস্তি আনলেও অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগী ও জমিদারদের অত্যাচার সাধারণ কৃষকের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। নিম্নে প্রাচীন ভারতের ইসলামপূর্ব যুগ, মুঘল যুগের রাজস্ব প্রশাসন এবং আধুনিক বাংলাদেশের বর্তমান ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুন বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
২.
প্রথম অধ্যায়: ইসলামপূর্ব প্রাচীন ভারতের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা
ইসলামপূর্ব
প্রাচীন ভারতে ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা মূলত রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন, ধর্মীয় অনুশাসন এবং
আঞ্চলিক প্রথার সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। প্রাচীন ভারতের ভূমিস্বত্ব ও রাজস্ব ব্যবস্থা
বোঝার জন্য প্রধান উৎস হিসেবে কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’, মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’, অশোকের
শিলালিপি, গিরিনগর শিলালিপি এবং সমকালীন বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে।
২.১
ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বিতর্ক
প্রাচীন
ভারতে জমির প্রকৃত মালিক কে ছিলেন—রাজা নাকি প্রজা—তা নিয়ে গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে
দীর্ঘ বিতর্ক বিদ্যমান:
- ব্রেলারের মতে, প্রাচীন
ভারতের একটি স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম ছিল যে জমির চূড়ান্ত মালিকানা থাকবে রাষ্ট্রের
হাতে।
- গ্রিক রাষ্ট্রদূত মেগাস্থিনিসের
‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, ভারতের সমস্ত ভূমির মালিকানা ছিল রাজার
এবং কোনো ব্যক্তি আইনত জমির একক মালিকানা পেত না।
- মেগাস্থিনিস অন্যত্র
উল্লেখ করেন, কৃষকেরা জমির ব্যবহারের জন্য রাজাকে কর প্রদান করত এবং উৎপাদিত ফসলের
এক-চতুর্থাংশ অংশ রাজাকে রাজস্ব হিসেবে দিতে হতো।
- তবে মেগাস্থিনিসের
বিপরীত তথ্যও প্রাচীন সাহিত্যে পাওয়া যায়; অনেক স্থানে উল্লেখ আছে যে কৃষকেরা
জমি দান, হস্তান্তর ও বিক্রি করার অধিকার রাখত।
- ধর্মশাস্ত্র ও স্মৃতিশাস্ত্রে
সাধারণ নাগরিকদের জমি দান, বিক্রয় ও বন্ধক রাখার ব্যক্তিগত অধিকারকে স্পষ্টভাবে
স্বীকার করা হয়েছে।
- প্রাচীন সাহিত্য ও
সমকালীন শিলালিপির বিভিন্ন প্রমাণ পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে প্রাচীন ভারতে
ভূমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানাও বিদ্যমান ছিল।
- ইতিহাসবিদ ড. ঘোষাল
মেগাস্থিনিসের রাজকীয় মালিকানা সংক্রান্ত বক্তব্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মনে করেন,
মেগাস্থিনিস মূলত রাষ্ট্রের খাস জমির (সীতা জমি) ক্ষেত্রেই কেবল ওই মন্তব্য করেছিলেন,
সাধারণ কৃষকের জমির ক্ষেত্রে নয়।
২.২
মৌর্য যুগে ভূমির শ্রেণিবিভাগ
মৌর্য
শাসনামলে ভারতে ভূমির প্রধানত দুই থেকে তিনটি রূপ দেখতে পাওয়া যায়:
- কৃষকের বংশানুক্রমিক
মালিকানাধীন জমি:
- এ ধরনের জমিতে রাজা
সরাসরি মালিক ছিলেন না, বরং তিনি কৃষকের বংশানুক্রমিক অধিকার রক্ষা করতেন।
- প্রজা বা কৃষক তার
অধিকার সুরক্ষার বিনিময়ে উৎপাদিত ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) রাজাকে কর হিসেবে প্রদান
করত।
- রাজস্বের এই এক-ষষ্ঠাংশ
অংশকে ‘ভাগ’ বলা হতো এবং এ কারণেই জৈমিনি রাজাকে ‘ষটভাগিস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
- তবে সোহগুড়া তাম্রলিপি
এবং মহাস্থানগড় শিলালিপির সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে সুযোগ পেলে রাজারা
প্রজার অধিকার খর্ব করতেন এবং কৃষক সর্বদা নিরঙ্কুশ অধিকার ভোগ করতে পারত না।
- কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে
উল্লেখ রয়েছে যে ভূমির উপরিভাগের পৈতৃক স্বত্ব কৃষকের থাকলেও মাটির নিচের খনিজ
দ্রব্য ও পানির ওপর রাজার একচ্ছত্র মালিকানা থাকত। ফলে খনিজ সম্পদ আবিষ্কৃত হলে
বা সেচের পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাজকীয় অধিকার মানতে কৃষক বাধ্য ছিল।
- সীতা জমি (রাজার
খাস জমি):
- ড. ঘোষালের মতে,
দ্বিতীয় প্রকার জমি ছিল ‘সীতা জমি’, যার ওপর রাজার নিরঙ্কুশ ও প্রত্যক্ষ মালিকানা
প্রতিষ্ঠিত ছিল।
- এ জমি রাজকীয় কর্মকর্তা
বা কর্মচারীদের তদারকিতে কৃষক, ক্রীতদাস কিংবা স্বাধীন মজুরদের দ্বারা চাষাবাদ
করানো হতো।
- চাষাবাদের বিনিময়ে
কৃষকদের ফসলের একটি অংশ প্রদান করা হতো।
- গ্রিক লেখক স্ট্র্যাবো
উল্লেখ করেছেন যে কৃষকেরা ফসলের এক-চতুর্থাংশ (১/৪) অংশ পাওয়ার শর্তে রাজকীয়
জমি আবাদ করত, যা ড. ঘোষালের মতে সীতা জমির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
- অর্থশাস্ত্রের ভাষায়
এসব খাস জমিতে কর্মরত কৃষকদের ‘স্ববীর্য উপজীবিন’ বা নিজ পরিশ্রমে জীবিকা উপার্জনকারী
বলা হতো।
- সমষ্টিগত বা যৌথ
মালিকানাধীন জমি:
- গবেষক ড. অতীন্দ্রনাথ
বসু তাঁর গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে উপরোক্ত দুই প্রকার জমি ছাড়াও প্রাচীন
ভারতে আরেক ধরনের জমি ছিল, যার মালিকানা কোনো ব্যক্তি বা রাজার একক হাতে না থেকে
পুরো ‘সমষ্টিগণ’ বা গ্রামের যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকত।
৩.
দ্বিতীয় অধ্যায়: মুঘল আমলের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা ও প্রশাসন
মুঘল
আমলে ভারতের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ ছিল ভূমিরাজস্ব। রাজকোষের
সমৃদ্ধি, সুগঠিত সামরিক বাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সুবিশাল সাম্রাজ্যের পরিচালনা সম্পূর্ণরূপে
ভূমিরাজস্ব আদাযের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
- সম্রাট বাবর ও হুমায়ুনের
শাসনামলে মূলত দিল্লি সালতানাত থেকে প্রাপ্ত প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই
রাজস্ব ব্যবস্থা পরিচালিত হতো।
- পরবর্তীকালে সম্রাট
আকবরের রাজত্বকালে রাজস্ব নীতিতে এক যুগান্তকারী ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়।
- বিখ্যাত মুসলিম আইনবিদ
আবু ইউসুফ তাঁর ‘কিতাবুল খারাজ’ গ্রন্থে ইসলামিক ভূমিরাজস্ব নীতির কিছু মূলনীতি
বর্ণনা করেছেন, যা মুঘল আমলেও প্রতিফলিত হয়:
- রাষ্ট্রের রাজস্ব
দাবি হবে ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক, প্রজার সাধ্যের অতিরিক্ত নয়।
- রাজস্ব নির্ধারণ
উৎপন্ন ফসল ভাগাভাগির মাধ্যমে অথবা ভূমির পরিমাপের ভিত্তিতে করতে হবে।
- স্থানীয় প্রচলিত
সামাজিক প্রথা ও রীতিকে শ্রদ্ধা জানাতে হবে, যদি তা প্রজার জন্য ক্ষতিকর বা ইসলামী
আইনের পরিপন্থী না হয়।
- আবুল ফজল বাংলার রাজস্ব
ব্যবস্থার বিশেষত্ব উল্লেখ করে লিখেছেন যে, বাংলার অধিবাসীরা শান্ত প্রকৃতির এবং
তারা সারা বছরের খাজনা আট মাসের কিস্তিতে পরিশোধ করত।
- বাংলায় সরকার ও গৃহস্থের
মধ্যে সরাসরি শস্য ভাগাভাগি না হওয়ায় কৃষকেরা নিজেরাই রুপোর মোহর বা টাকা নিয়ে
নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয়ে রাজস্ব জমা দিত।
৩.২
আকবরের রাজস্ব সংস্কার ও টোডরমলের অবদান
সম্রাট
আকবরের ২৪তম রাজত্বকালে অর্থসংক্রান্ত সংস্কারের মাধ্যমে মুঘল রাজস্ব প্রশাসন চূড়ান্ত
রূপ লাভ করে, যার পেছনে মূল কারিগর ছিলেন রাজস্ব বিশেষজ্ঞ রাজা টোডরমল।
ক.
কর এলাকা গঠন ও ক্লোরি প্রথা (১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দ)
- ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে
সম্রাট আকবর প্রচলিত প্রথাগত জায়গীরদার প্রথা বিলুপ্ত করে সমগ্র সাম্রাজ্যকে
১৮২টি নির্দিষ্ট পরগণায় বিভক্ত করেন।
- প্রতিটি পরগণাকে এক
একটি ‘ক্লোরি’ ইউনিটে রূপান্তরিত করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল প্রতিটি পরগণা থেকে
১ কোটি ‘দাম’ (দাম হলো মুঘল তাম্র মুদ্রা, যেখানে ৪০ দামে ১ রৌপ্য মুদ্রা বা রূপী
হতো) রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায় করা।
- এই রাজস্ব আদায়ের
প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকতেন একজন অফিসার, যাকে ‘আমীর’, ‘আমালগুজার’ বা ‘ক্লোরি’
বলা হতো।
- প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী
ক্ষুদ্রতম ইউনিট ‘কসবা’ বা ‘ইকতা’ মিলে গঠিত হতো ‘মহল’ (উপজিলা), কয়েকটি মহল
নিয়ে ‘সরকার’ (জেলা) এবং কয়েকটি সরকার নিয়ে গঠিত হতো ‘পরগণা’।
খ.
জমি জরিপ প্রথা (পাইমাইশ ও জাবীর)
- টোডরমল দায়িত্ব নেওয়ার
পূর্বে জমি জরিপের জন্য আঁশ দিয়ে তৈরি দড়ি ব্যবহার করা হতো, যা ‘পাইমাইশ’ নামে
পরিচিত ছিল। রোদের তাপে বা ভেজা অবস্থায় এই দড়ির দৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হওয়ায়
পরিমাপ ভুল হতো।
- টোডরমল এই প্রথা বাতিল
করে শক্ত বাঁশের দুই মাথায় লোহার বলয় বা বেষ্টনী মুড়িয়ে তৈরি নিখুঁত পরিমাপক
দণ্ড চালু করেন, যাকে ‘জাবীর’ বলা হতো। এর মাধ্যমে ভূমির আয়তন সুনির্দিষ্টভাবে
পরিমাপ করা সম্ভব হয়।
গ.
ভূমির শ্রেণিবিভাগ ও রাজস্ব হার
জরিপ
সম্পন্ন করার পর ভূমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদনের ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে আকবরের আমলে
জমিকে চার ভাগে ভাগ করা হয়:
- পোলজ: যে জমিতে প্রতি বছর নিয়মিত চাষাবাদ হতো এবং প্রতি
বছর রাজকোষে কর প্রদান করা হতো।
- পারৌতি: যে জমির উর্বরতা শক্তি ধরে রাখার জন্য চাষাবাদের
পর কিছুদিন পতিত রাখা হতো।
- চাচর: যে জমি টানা তিন থেকে চার বছর অনাবাদী বা পতিত
পড়ে থাকত।
- বঞ্জর: যে জমি টানা পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে চাষাবাদ
করা হতো না।
পোলজ
এবং পারৌতি জমিকে আবার শস্যের মান অনুযায়ী তিন ভাগে ভাগ করা হতো—উৎকৃষ্ট, মধ্যম ও
নিকৃষ্ট।
- উৎকৃষ্ট বিঘা: ৫০ মন
- মধ্যম বিঘা: ৪০ মন
- নিকৃষ্ট বিঘা: ৩০ মন
- গড় হিসাব: (৫০ + ৪০ + ৩০) / ৩ = ৪০ মন।
- এই গড় উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ
(১/৩ অংশ) অর্থাৎ সাড়ে ১৩ মন রাজস্ব হিসেবে সরকারের জন্য ধার্য করা হতো।
ঘ.
কর নির্ধারণ পদ্ধতিসমূহ
আকবরের
আমলে মূলত তিনটি প্রধান কর পদ্ধতি প্রচলিত ছিল:
- যাবতি প্রথা: ফসল কাটার সময় হলে ‘বিতিকিচি’ নামক কর্মচারীরা
মাঠ পরিমাপ করে রেকর্ড প্রস্তুত করতেন এবং কৃষকদের করের লিখিত রসিদ দিতেন, ফলে
কর্মচারীদের পক্ষে দুর্নীতি করা সম্ভব হতো না।
- নাসাখ প্রথা: এটি ছিল সরকার ও কৃষকদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তভিত্তিক
পদ্ধতি (যা শেরশাহের কবুলিয়ত ও পাট্টার অনুরূপ)। আবুল ফজল একে ‘মুকতাই’ বা ‘কানকুট’
নামেও অভিহিত করেছেন।
- গালা বখশি (বাটাই
প্রথা): উৎপাদিত শস্য সরাসরি
ভাগাভাগির এই পদ্ধতি তিন প্রকারের ছিল:
- খাত বাটাই: শস্য কাটার আগেই জমিতে দাগ বা খাত কেটে কৃষক
ও সরকারের অংশ চিহ্নিত করা হতো।
- লাঙ্গ বাটাই: শস্য কাটার পর তা মাড়াই করে তিন ভাগে ভাগ করা
হতো।
- রাশি বাটাই: শস্য কাটার পর মাড়াই না করেই সরাসরি আঁটি বা
গাদা সাজিয়ে তিন ভাগ করা হতো।
ঙ.
দশশালা বন্দোবস্ত ও তাকাভি ঋণ
- আকবর তাঁর রাজত্বের
২৪তম বছরে বিগত ১০ বছরের গড় উৎপাদন ও মূল্যের ওপর ভিত্তি করে ‘দশশালা বন্দোবস্ত’
প্রবর্তন করেন।
- কৃষি ব্যবস্থার সার্বিক
উন্নতির জন্য কৃষকদের সরকারি তহবিল থেকে বিশেষ ঋণ দেওয়া হতো, যাকে ‘তাকাভি ঋণ’
বলা হতো। কৃষকেরা সহজ বাৎসরিক কিস্তিতে এ ঋণ শোধ করতে পারত।
- অনাবৃষ্টি, খরা বা
অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাষ্ট্র থেকে রাজস্ব মওকুফ করা
হতো।
- রাজস্ব নগদ অর্থ বা
শস্য—যেকোনো মাধ্যমে পরিশোধের স্বাধীনতা কৃষকের ছিল।
৩.৩
বিশেষ ভূমিস্বত্ব (আলফে) ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা
খারাজ
বা সাধারণ ভূমিরাজস্বের বাইরেও মুঘল আমলে বিশেষ পাঁচ ধরনের ভূমিস্বত্ব বা জমি অনুদান
ব্যবস্থা ছিল:
- খালসা (খাস জমি): সরাসরি সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকা জমি,
যা থেকে অর্জিত রাজস্ব রাজকোষে যেত। ১৫৬৩ সালে ইতিমাদ খান খালসা জমির তালিকা তৈরি
করে পুনর্গঠন করেন।
- ইকতা (জায়গীর): সামরিক কর্মকর্তা ও অভিজাতদের সেবার বিনিময়ে
প্রদত্ত জমি।
- সুয়ূরগাল বা মিলক: ধর্মীয়, শিক্ষা বা দাতব্য উদ্দেশ্যে প্রদত্ত
করমুক্ত জমি অনুদান।
- সুলহি: আকবরের ‘সুলহ-ই-কুল’ নীতি মেনে যেসব বিজিত দেশীয়
রাজা মুঘল সাম্রাজ্যের আনুগত্য স্বীকার করতেন, তাঁদের জমিতে আরোপিত কর বা ভূখণ্ড।
- আলতামঘা: রাজকীয় কৃপাদৃষ্টি লাভকারী বিশেষ আমাত্য বা অভিজাতদের
প্রদত্ত স্থায়ী করমুক্ত জমি ইজারা।
রাজস্ব
আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে কেন্দ্রীয় স্তরে ‘প্রধান দেওয়ান’, সুবা পর্যায়ে ‘সুবা-দেওয়ান’,
সরকার পর্যায়ে ‘আমিন’ এবং তাঁদের অধীনে বিতিকিচি, পোদ্দার, কানুনগো, মোকাদ্দাম ও পাটোয়ারী
নিয়োগ দেওয়া হতো। এছাড়া সম্রাট আকবর ১৫৬৩ সালে তীর্থযাত্রী কর এবং ১৫৬৪ সালে অমুসলিমদের
নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত ‘জিজিয়া কর’ সম্পূর্ণ রহিত করেন। ঐতিহাসিক ড. ভি. এ. স্মিথ
মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থার প্রশংসায় বলেছেন, "In short the system was an
admirable one. The principles were sound and the practical instructions to the
officials all that could be desired."
৪.
তৃতীয় অধ্যায়: ব্রিটিশ আমল থেকে আধুনিক বাংলাদেশের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার বিবর্তন
মুঘল
সাম্রাজ্যের পতনের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি লাভ করে। ১৭৭২
সালে ওয়ারেন হেস্টিংস জেলা পর্যায়ে রাজস্ব আদায়ের জন্য ‘কালেক্টর’ পদ সৃষ্টি করেন
এবং পাঁচসনা ও দশসনা নিলামি বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন।
[প্রাচীন
ভারত] ➔ [মুঘল সাম্রাজ্য]
➔ [ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
(১৭৬৫)] ➔
[চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩)] ➔
[ইবিএসএটিএ (১৯৫০)] ➔
[ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ (১৯৭৬/২০১৫)]
৪.১
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারি প্রথা (১৭৯৩–১৯৫০)
- ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস
প্রবর্তন করেন ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’।
- এ ব্যবস্থার প্রধান
বৈশিষ্ট্য ছিল ‘সূর্যাস্ত আইন’, যেখানে প্রতি বছর ৩০ চৈত্র সূর্য ডোবার আগেই জমিদারকে
রাজকোষে নির্দিষ্ট খাজনা পরিশোধ করতে হতো, অন্যথায় জমিদারি নিলামে উঠত।
- এর ফলে নায়েব, গোমস্তা,
পাইক-পেয়াদাদের মাধ্যমে কৃষকদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে রাজস্ব আদায়
করা হতো।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগেও
খাজনা মাফ না হওয়ায় কৃষকেরা অতিষ্ঠ হয়ে ফ্যারায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের
কেল্লা, রংপুর-দিনাজপুরের কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ ও পাবনা কৃষক বিদ্রোহের মতো
প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
- ১৮৮৫ সালে প্রজার কিছুটা
অধিকার রক্ষায় ‘বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন’ (BT Act) পাস হয়। পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে
গঠিত ‘ল্যান্ড রেভিনিউ কমিশন’ (ফ্লাউড কমিশন)-এর সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৫০ সালে
‘জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন’ (EBSATA) পাস হলে বাংলায় ক্ষতিকর জমিদারি
প্রথার বিলোপ ঘটে এবং রাষ্ট্র সরাসরি প্রজার মালিক হয়ে ওঠে।
৪.২
স্বাধীন বাংলাদেশের ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা
বাংলাদেশ
স্বাধীন হওয়ার পর ভূমি রাজস্বকে আধুনিক ও গণমুখী করতে ১৯৭৬ সালে ‘ভূমি উন্নয়ন কর
অধ্যাদেশ’ (Land Development Tax Ordinance) জারি করা হয়।
- ২৫ বিঘা পর্যন্ত
কর মওকুফ: কৃষকদের স্বস্তি দিতে
বাংলা ১৩৯৮ সন (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে ২৫ বিঘা (৮.২৫ একর) পর্যন্ত কৃষিজমির ভূমি
উন্নয়ন কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়।
- মওকুফপ্রাপ্ত কৃষকদের
শুধুমাত্র মালিকানা প্রমাণের দাখিলা গ্রহণের জন্য হোল্ডিং প্রতি পূর্বে ২ টাকা
এবং বাংলা ১৪২২ সন থেকে সন প্রতি মাত্র ১০ টাকা হারে টোকেন ফি দিতে হয়।
২০১৫
সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নতুন ভূমি উন্নয়ন করের হার
সরকারের
ভূমি মন্ত্রণালয় ৩০ জুন ২০১৫ তারিখে ব্যবহারভিত্তিক ভূমি উন্নয়ন করের নতুন হার নির্ধারণ
করে প্রজ্ঞাপন জারি করে, যা ১ জুলাই ২০১৫ থেকে কার্যকর হয়:
|
ভূমির শ্রেণি ও ব্যবহার |
ধারণকৃত পরিমাপ / এলাকা |
নতুন বাৎসরিক হার (প্রতি শতাংশ) |
|
সাধারণ কৃষি জমি |
২৫ বিঘা (৮.২৫ একর) পর্যন্ত |
কর মওকুফ (ফি ১০ টাকা/হোল্ডিং) |
|
উচ্চ খামার/বাণিজ্যিক কৃষি |
২৫ বিঘার অধিক কৃষিজমি, কিংবা যেকোনো আয়তনের চা,
কফি, রাবার, ফল/ফুল বাগান, বাণিজ্যিক মৎস্য/চিংড়ি চাষ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খামার |
২ টাকা (প্রতি শতাংশ) |
|
অকৃষি জমি (বাণিজ্যিক/আবাসিক) |
অগ্রগতির ভিত্তিতে সমগ্র দেশকে ৬টি ধাপে বিভক্ত করে
এলাকাভিত্তিক হার নির্ধারিত |
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত ধাপভিত্তিক হার |
৪.৩
তৃণমূল ভূমি অফিসের অবস্থা ও ডিজিটালাইজেশন
বর্তমানে
প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ‘ইউনিয়ন ভূমি অফিস’ রাজস্ব আদায় ও দাখিলা প্রদানের দায়িত্ব
পালন করছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত জীর্ণতা, আসবাবপত্র ও কক্ষের অভাব, পুরোনো
রেজিস্টার বিনষ্ট হওয়া এবং জনবল সংকটের কারণে কাক্সিক্ষত সেবা বিঘ্নিত হয়। সেবাদান
প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে সনাতন ম্যানুয়াল ব্যবস্থার বদলে আধুনিক ই-নামজারি
ও ডিজিটাল স্মার্ট ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
৫. ভূমি ব্যবহার ও কর পরিশোধের
আবশ্যকীয় নিয়মকানুন (Rules and Guidelines)
সাধারণ নাগরিক ও ভূমি মালিকদের
সুবিধার্থে বর্তমান প্রচলিত ভূমি আইন ও রাজস্ব ব্যবস্থার প্রধান প্রধান নিয়মাবলী নিম্নে
তুলে ধরা হলো:
১. কৃষিজমি কর মওকুফ সুবিধা:
- কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের মালিকানাধীন কৃষিজমির
মোট পরিমাণ ২৫ বিঘা (৮.২৫ একর) বা তার কম হলে তাকে কোনো বাৎসরিক ভূমি উন্নয়ন
কর দিতে হবে না।
- মওকুফভুক্ত জমি হলেও মালিকানা হালনাগাদ রাখতে ও
দাখিলা (রসিদ) গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ফি (সন প্রতি ১০ টাকা) প্রদান
করে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে দাখিলা সংগ্রহ করতে হবে।
২. বাণিজ্যিক ও বিশেষ কৃষি
খামারের কর নিয়ম:
- চা, কফি, রাবার বাগান, বাণিজ্যিক ফলের বাগান, বাণিজ্যিক
হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর খামার কিংবা বাণিজ্যিক মৎস্য ও চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে
ভূমির পরিমাপ যাই হোক না কেন, সম্পূর্ণ জমির জন্য শতাংশ প্রতি বাৎসরিক ২ টাকা
হারে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান করতে হবে।
৩. অকৃষি ও বাণিজ্যিক ভূমির
কর নিয়ম:
- শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত জমি, আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক
প্রতিষ্ঠান বা শহরের অকৃষি জমির ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের সরকার নির্ধারিত প্রজ্ঞাপনের
৬টি ভৌগোলিক ধাপ (Tier) অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে কর পরিশোধ করতে হবে।
৪. নামজারি বা মিউটেশন
(Mutation):
- জমি ক্রয়, দান বা পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত হলে অবিলম্বে
ইউনিয়ন/উপজেলা ভূমি অফিসে আবেদন করে নিজ নামে ‘নামজারি’ বা মিউটেশন করিয়ে নিতে
হবে, অন্যথায় নতুন মালিকের নামে খতিয়ান বা দাখিলা ইস্যু করা সম্ভব হয় না।
৫. সময়মতো কর পরিশোধ ও
অনলাইন সেবার ব্যবহার:
- বকেয়া কর এড়াতে প্রতি অর্থবছরে নিয়মিত কর পরিশোধ
করে বৈধ দাখিলা বা খাজনার রসিদ সংরক্ষণ করা আবশ্যক। বর্তমানে ডিজিটালাইজেশনের
ফলে ঘরে বসেই অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান করা
যায়।
৬. উপসংহার (Conclusion)
প্রাচীন ভারতের কায়িক পরিশ্রমনির্ভর প্রজা-রাজা ভাগাভাগি থেকে শুরু করে
মৌর্য যুগের সীতা জমি, মুঘল যুগের টোডরমলীয় জরিপ ও জাবীর দণ্ড, ঔপনিবেশিক যুগের চিরস্থায়ী
বন্দোবস্তের শোষণের ইতিহাস পেরিয়ে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা
এক দীর্ঘ ও জটিল বিবর্তনের ফসল। বর্তমান ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা ও ডিজিটালাইজেশনের
উদ্যোগ সাধারণ প্রজার ভূমিস্বত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় রাজকোষকে সমৃদ্ধ
করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url