ভাবনা ও ভবিষ্যৎ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর কল্পবিজ্ঞানের কোনো বিষয় নয়। বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও এর প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। ফলে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে, এআই কি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে?
সম্প্রতি অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা Jeff Bezos এই প্রশ্নের একটি ভিন্ন উত্তর দিয়েছেন। তাঁর মতে, এআই মানুষের জন্য হুমকি নয়; বরং এটি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং ভবিষ্যতে শ্রমের চাহিদা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
বেজোসের এই বক্তব্য নতুন নয়, তবে তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে এআই নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, যেসব কাজ নিয়মমাফিক এবং পুনরাবৃত্তিমূলক, সেসব ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে সফটওয়্যার ও রোবট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে। এর ফলে অনেক কর্মী চাকরি হারাতে পারেন।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের অন্য একটি শিক্ষাও দেয়। শিল্পবিপ্লবের সময় যন্ত্রের আগমনেও একই ধরনের ভয় দেখা দিয়েছিল। পরে দেখা গেছে, কিছু পেশা হারিয়ে গেলেও নতুন অসংখ্য পেশার জন্ম হয়েছে। কম্পিউটার আসার সময়ও অনেকে ভেবেছিলেন কর্মসংস্থান কমে যাবে। বাস্তবে প্রযুক্তি নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করেছে।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও হয়তো একই ঘটনা ঘটতে পারে। কিছু প্রচলিত কাজ কমে যেতে পারে, কিন্তু নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়বে। এআই পরিচালনা, তথ্য বিশ্লেষণ, রোবট ব্যবস্থাপনা, মেশিন প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত তত্ত্বাবধান এবং সৃজনশীল কাজে মানুষের প্রয়োজন থেকেই যাবে।
তবে আশাবাদের পাশাপাশি সতর্ক থাকারও কারণ আছে। প্রযুক্তির সুফল যদি কেবল বড় কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে বৈষম্য বাড়তে পারে। শ্রমবাজারের একটি অংশ চাপের মুখে পড়তে পারে। তাই এআইয়ের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমিকবান্ধব নীতিমালাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একই অনুষ্ঠানে বেজোস মহাকাশে স্থায়ী মানব উপস্থিতির স্বপ্নের কথাও বলেছেন। তাঁর ধারণা, ভবিষ্যতে চাঁদ শুধু গবেষণার কেন্দ্র নয়, মানুষের বসবাসের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আজ থেকে কয়েক দশক আগে এমন কথা অবাস্তব মনে হলেও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।
এদিকে প্রযুক্তি মেলায় প্রদর্শিত মস্তিষ্কের সংকেত দিয়ে নিয়ন্ত্রিত মানবসদৃশ রোবট আরেকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—মানুষ ও যন্ত্রের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? একসময় যে প্রযুক্তি চলচ্চিত্রের কল্পনায় সীমাবদ্ধ ছিল, তা আজ বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে এআইকে শুধুমাত্র চাকরি ধ্বংসকারী প্রযুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আবার অন্ধ আশাবাদও যথার্থ নয়। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা এই প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করি, কীভাবে শিক্ষা ও দক্ষতাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিই এবং প্রযুক্তির সুফল কতটা ন্যায্যভাবে সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারি তার ওপর।
আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এটি নয় যে এআই মানুষকে প্রতিস্থাপন করবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, পরিবর্তিত পৃথিবীতে মানুষ নিজেকে কত দ্রুত নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারবে। তখনই বোঝা যাবে, এআই মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী, নাকি তার সবচেয়ে শক্তিশালী সহযাত্রী।
ঝরোকা

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন