ভেতর লুকানো এক বিদ্রোহী স্বর্ণময়ী আত্মা
ড. আবু নোমান
কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই মনে হয়, আমরা যেন কেবল একজন মানুষকে নয়, একটি সম্পূর্ণ দৃশ্যভাষাকে ডাকছি। গুস্টাভ ক্লিমট তেমনই এক নাম। তাঁর ক্যানভাসে সোনালি কেবল একটি রঙ নয়, যেন আলোকোজ্জ্বল এক মোহনীয় দৃশ্যেও ঝালর। অলঙ্কার কেবল সাজ নয়, যেন গোপন সংকেত। আর নারীদেহ কেবল অবয়ব নয়, যেন সৌন্দর্য, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, নীরবতা ও অস্থিরতার একসঙ্গে লেখা কোনো দীর্ঘ কবিতা।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের শুরু, এই উত্তরণকালের ইউরোপীয় শিল্পধারায় ক্লিমট যেন এক আশ্চর্য সেতু। একদিকে রোমান্টিক আবহ, অন্যদিকে আধুনিকতার উন্মোচন। তাঁর ছবির দিকে তাকালে মনে হয়, পৃথিবীটা হঠাৎ একটু বেশি দীপ্ত, একটু বেশি জটিল, একটু বেশি মানবিক হয়ে উঠেছে।১৮৬২ সালের ১৪ জুলাই, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে জন্ম নেন গুস্টাভ ক্লিমট। তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল সেই শহরেই, শেষও হয় সেখানেই। ১৯১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে। যেন তাঁর জীবনও এক পূর্ণ বৃত্ত, শুরু ভিয়েনায়, শেষও ভিয়েনায়।
তাঁর পিতা আর্নস্ট ক্লিমট ছিলেন স্বর্ণ ও রূপার খোদাইকর্মী। মা আনা ফিনস্টার ছিলেন সংগীত ও শিল্পসংবেদনার ধারক। এই দুই উৎস কারুকাজের শৃঙ্খলা আর সৌন্দর্যবোধের নরম স্রোত মিলেই ক্লিমটের শিল্পীসত্তার ভিত গড়ে দেয়। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ভেতরে রেখা, রূপ, ভঙ্গি, মানুষের মুখ ও শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা গল্পের প্রতি আকর্ষণ জন্মেছিল।
অনেকের কাছে কৈশোর মানে অনিশ্চয়তা। ক্লিমেটর ক্ষেত্রে তা হয়ে উঠেছিল স্বপ্নজয়ের নিশানা। চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন ভিয়েনার Kunstgewerbeschule এ। অর্থাৎ অস্ট্রিয়ান মিউজিয়াম অব আর্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির অধীনস্থ স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস-এ। ১৮৭৬ থেকে ১৮৮২, এই ছয় বছরের শিক্ষাই তাঁকে শুধু আঁকা শেখায়নি; তাঁকে শিল্পের ভাষা পড়তে শিখিয়েছিল।
পরে ছোট ভাই আর্নস্ট ও বন্ধু ফ্রাঞ্জ মাচকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন। প্রথমে ফটোগ্রাফ দেখে প্রতিকৃতি অঙ্কন, তারপর ধীরে ধীরে বড় অলঙ্করণমূলক অর্ডার। এই শুরুটা ছিল নীরব, পরিশ্রমী, প্রায় কারিগরি ধরনের। কিন্তু এই নীরবতার ভেতরেই গড়ে উঠছিল এক বিস্ফোরক শিল্পীসত্ত্বা।
১৮৮০ সালে অধ্যাপক ফার্দিনান্দ লাউফবার্গার এর সুপারিশে ক্লিমট ও তাঁর সহযাত্রীরা প্রথম সরকারি অর্ডার পান একটি স্পার জন্য সিলিং পেইন্টিং। তখনকার জনপ্রিয় শিল্পী হান্স মাকার্ট এর প্রভাব, প্রাচীন উপমা, আর অলঙ্করণময় রচনাভঙ্গি তাঁদের কাজে ছিল সুস্পষ্ট।
এরপর ১৮৮৬ সালে আসে আরেক বড় কাজ, ভিয়েনার বুর্গথিয়েটার সাজানোর দায়িত্ব। সেখানে ক্লিমট আঁকেন The Theatre in Taormina। এই কাজের পরই বোঝা গেল, তিনি আর পাঁচজন দক্ষ চিত্রকরের মত নন, তাঁর মধ্যে আছে অন্য ধাঁচের শিল্পধারা। সেই স্বীকৃতি খুব বেশি দেরি করেনি। ১৮৮৮ সালে অস্ট্রিয়ার সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফ তাঁকে দেন Golden Order of Merit। ১৮৯০ সালে তিনি পান আরও এক গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় পুরস্কার।
ভিয়েনার Kunsthistorisches Museum এর সিঁড়িঘরের অলঙ্করণে কাজ করতে গিয়ে ক্লিমটের শিল্পীসত্তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। Sculpture, Tragedz এই ধরনের কাজগুলোর মধ্যে দেখা যায় এমন কিছু লক্ষণ, যা পরে তাঁর স্বাক্ষর হয়ে দাঁড়ায়, সমকালীন নারী, আধুনিক ভঙ্গি, সোনালি আভা, প্রতীকী ভাষা, সূক্ষ্ম রেখা, আর বিমূর্ততার দিকে ঝোঁক।
১৮৯২ সাল ক্লিমটের জীবনে গভীর ক্ষতের বছর। একই বছরে তিনি হারান তাঁর পিতা ও ভাইকে। এই আঘাত তাঁকে ভিতরে ভিতরে নাড়িয়ে দেয়। অনেকে মনে করেন, এই শোক তাঁর শিল্পচেতনায় এক অন্ধকার, গভীর, এবং আরও তীব্র অন্তরধ্বনি এনে দেয়।
ঠিক এই সময়েই তিনি পান ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেট হল-এর জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব, Philosophy, Medicine, Ges Jurisprudence। এখানেই যেন তিনি প্রথার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন।
এই তিনটি চিত্র পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু সেগুলো নিয়ে যে ঝড় উঠেছিল, তা ক্লিমটের শিল্পীজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি বুঝে যান, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনওই সহজ হবে না।
১৮৯৭ সালে ক্লিমট কয়েকজন তরুণ শিল্পীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন Vienna Secession। তিনিই হন এর প্রথম সভাপতি। এই গোষ্ঠীর বিশ্বাস ছিল স্পষ্ট শিল্পের কোনো শৃঙ্খল নেই, কোনো বদ্ধতা নেই; শিল্পের আসল নাম স্বাধীনতা।
ক্লিমটকে বোঝার জন্য শুধু তাঁর ছবির নাম জানলেই হয় না, তাঁর ছবির দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হয়।
তাঁর ভিয়েনা ছিল অদ্ভুত এক শহর বাইরে মার্জিত, ভদ্র, সুশৃঙ্খল; ভেতরে আকাঙ্ক্ষা, অস্বস্তি, কামনা, দমন, অদৃশ্য টানাপোড়েন। ক্লিমট সেই লুকানো ভেতরকার শহরটাকেই প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর চিত্রে কামনা কোনো ফিসফাস নয়, তা যেন এক সরাসরি আড়ম্বরপূর্ণ ঘোষণা।
এই কারণেই তিনি একই সঙ্গে দুই বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিলেন ভালোবাসা এবং ক্ষোভ। অনেকে তাঁকে মুক্তির শিল্পী বলে দেখেছে, অনেকে দেখেছে অশান্তির উৎস হিসেবে। কিন্তু তিনি থামেননি| বরং বিতর্ক যেন তাঁর শিল্পকে আরও দৃঢ় করেছে।
গুস্টাভ ক্লিমটের শিল্পজগতের কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার ফিরে আসে নারী। তবে এই নারী কোনো একরৈখিক অবয়ব নয়। তিনি কখনও আকাঙ্ক্ষা, কখনও রহস্য, কখনও আত্মমগ্নতা, কখনও বিপদ, কখনও সৌন্দর্যের দীপ্ত প্রতীক। ক্লিমটের ক্যানভাসে নারীদেহ, অলঙ্কার, রেখা, এবং প্যাটার্ন মিলে এক এমন দৃশ্যভাষা তৈরি করে, যা শুধু দেখা যায় না, পড়া যায়।
তাঁর শিল্পে মানব অনুভূতি, প্রেম, যৌনতা, জীবন, মৃত্যু, আত্মপ্রকাশ, সামাজিক অবস্থান, সবকিছুই ভিজ্যুয়াল রূপ পায়। Portrait of Adele Bloch-Bauer, The Kiss, Death and Life এসব কাজের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তিনি কেবল ছবি আঁকছিলেন না; তিনি মানুষের অভ্যন্তরীণ জীবনকে অলঙ্করণে, প্রতীকে, শরীরী ইঙ্গিতে অনুবাদ করছিলেন।
Philosophy (1900), Medicine (1901), Goldfish (1902), Beethoven Frieze (1902), Water Snakes I (1904–07), Fulfillment (1905–07), The Sunflower (1907), The Kiss (1907–08), Judith II (1909), Avenue in the Park of Kammer Castle (1912), Portrait of Adele Bloch-Bauer II (1912), The Maiden (1913), Death and Life (1911, 1916), The Women Friends, Adam and Eve (1917–18), Ges The Bride (1917–18)|
এই তালিকার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, তিনি একই সঙ্গে দর্শন, শরীর, প্রকৃতি, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, অন্তরঙ্গতা, মৃত্যু এবং মানব অস্তিত্বের নানা স্তর নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর ক্যানভাসে সৌন্দর্য কখনও নিস্তরঙ্গ নয়, তা সবসময় স্পন্দিত।
ক্লিমটের বড় শক্তি এখানেই, তাঁর ছবি নিছক সুন্দর নয়।| তা কিছু বলে।
তাঁর ক্যানভাসে অলঙ্কার ও বিমূর্ততা কেবল সাজসজ্জা নয়, তা অনুভূতির গঠন। তাঁর রঙ কেবল দৃশ্যমানতা নয়, তা মানসিক আবহ। তাঁর প্রতীক কেবল ইঙ্গিত নয়, তা দর্শকের সঙ্গে নীরব সংলাপ।
Beethoven Frieze-এ তিনি শিল্পকে মানবতার প্রতীক হিসেবে দাঁড় করান। Death and Life-এ জীবন ও মৃত্যুর সংঘর্ষকে এমনভাবে ধরেন, যেন ক্যানভাসটি এক দার্শনিক আয়না হয়ে ওঠে। তাঁর ছবির দিকে তাকালে মনে হয়, এগুলো শুধু চোখের জন্য নয়, মন এবং হৃদয়ের জন্যও তৈরি।
গুস্টাভ ক্লিমট কেবল তাঁর সময়ের শিল্পী হয়ে থাকেননি। তিনি সময় পেরিয়েও বেঁচে আছেন।
অস্ট্রিয়া ও বিদেশে Secession-এর নানা প্রদর্শনীতে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়েছে ভিয়েনার Belvedere Gallery (2000–01), নিউইয়র্কের প্রদর্শনীস্থান (২০০১), এবং কানাডার Belvedere Gallery (2000–01)-তে। এইসব আয়োজন দেখিয়ে দেয়, তাঁর মৃত্যু তাঁর শিল্পকে শেষ করতে পারেনি। বরং তাঁর অনুপস্থিতিই তাঁর উপস্থিতিকে আরও দীপ্ত করেছে।
Gustav Klimt (wd«U&R †bvfUwb, 1967),
Gustav Klimt: Drawings and Paintings (1976),
Gustav Klimt: Erotic Drawings (1980),
Gustav Klimt: Drawings (1984),
Frauen/Gustav Klimt (1985),
Gustav Klimt: Landscapes (1988),
Ges Gustav Klimt Masterpieces (1990)|
এত বই, এত আলোচনা, এত ফিরে দেখা, এসবই প্রমাণ করে, ক্লিমট কেবল একটি শিল্পনাম নন, তিনি এক অবিরাম পাঠ, গুস্টাভ ক্লিমটকে আজও এত গভীরভাবে মনে রাখার কারণ একটাই, তিনি শুধু ছবি আঁকেননি, তিনি দৃশ্যমান আবেগ নির্মাণ করেছিলেন।
তিনি দেখিয়েছেন, শিল্প কেবল দেয়ালে টাঙানো কোনো সৌন্দর্য নয়, শিল্প হতে পারে প্রশ্ন, প্রলোভন, প্রতিবাদ, আত্মদর্শন, নীরবতা, শরীর, দার্শনিকতা, এমনকি ভেতরকার অন্ধকারেরও আলোকিত অনুবাদ। তাঁর ক্যানভাসে স্বর্ণ আছে, কিন্তু সেই স্বর্ণের ভেতরে মানুষের একাকিত্বও আছে। সেখানে প্রেম আছে, কিন্তু তার পাশে মৃত্যু দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে সৌন্দর্য আছে, কিন্তু তা কখনও নিরাপদ নয়।
এই কারণেই গুস্টাভ ক্লিমটকে শুধু দেখা যায় না, তাঁকে অনুভব করতে হয়। আর একবার সত্যি সত্যি অনুভব করা গেলে, তিনি আর সহজে মন থেকে মুছে যান না।
গুস্টাভ ক্লিমটের শিল্পের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, আমরা যেন কোনো ছবির সামনে নই, বরং এক স্বর্ণাভ, নীরব, গোপন জগতের দরজায় এসে থেমে আছি। সেখানে সৌন্দর্য শুধু দেখা যায় না, ধীরে ধীরে আমাদের ঘিরে ফেলে। সেখানে অলঙ্কার নিছক সাজ নয়, প্রতিটি রেখা যেন এক অনুচ্চারিত ভাষা, প্রতিটি দেহরেখা যেন এক গোপন অনুভূতির অনুবাদ, প্রতিটি সোনালি বিস্তার যেন আলো ও অন্ধকারের মাঝখানে মানুষের চিরন্তন দাঁড়িয়ে থাকার এক শিল্পিত স্বীকারোক্তি।
ক্লিমটের ক্যানভাসে প্রেম আছে, কিন্তু তা নিছক কোমল নয়; সেখানে কামনা আছে, কিন্তু তা কেবল শরীরের নয়; সেখানে মৃত্যু আছে, কিন্তু তা শেষের অন্ধকার হয়ে নয়, জীবনের গভীরতাকে আরও তীব্র করে তোলার এক নীরব উপস্থিতি হয়ে। এই জন্যই তাঁর শিল্প আমাদের চোখে এসে থামে না, তা মনের আরও গভীরে নেমে যায়, সেখানে আলোড়ন তোলে, মোহ তৈরি করে, আর আমাদের ভেতরে এমন এক সৌন্দর্যবোধ জাগিয়ে তোলে, যাকে ভাষায় সম্পূর্ণ ধরা যায় না| হয়তো এ কারণেই গুস্টাভ ক্লিমট কেবল একজন শিল্পীর নাম নন; তিনি এক অনুভব, এক বিস্ময়, এক স্বর্ণময় স্বপ্নের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি, যা একবার হৃদয়ে ঢুকে গেলে আর সহজে নিভে যায় না। তাঁর শিল্প আমাদের শুধু মুগ্ধ করে না, আমাদের থামায়, আমাদের টানে, আমাদের নীরবে বদলে দেয়। আর সেই বদলে যাওয়ার মুহূর্তেই আমরা বুঝতে পারি, কিছু সৌন্দর্য আছে, যা দেখা শেষ হয়, কিন্তু যার আবেশ কখনও শেষ হয় না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন