পলাশী বিপর্যয়য়ের প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা

 

পলাশী বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা

পলাশী, বাংলার ইতিহাসে একটি নাম, একটি যুদ্ধ এবং একই সঙ্গে একটি গভীর ঐতিহাসিক প্রতীক। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে সংঘটিত যুদ্ধ শুধু বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেনি; এর দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার ওপরও পড়েছিল। পলাশীর বিপর্যয়কে তাই কেবল একটি যুদ্ধের পরাজয় হিসেবে দেখলে ইতিহাসের বৃহত্তর শিক্ষা অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়।



পলাশীর পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ঐতিহাসিক কাল বিবেচনায় পলাশী খুব বেশি আগের ঘটনা নয়। ভাগীরথীর তীরে পলাশীর আম্রকাননের স্মৃতি আজও বাংলার ইতিহাসসচেতন মানুষের মনে গভীর বেদনা ও প্রশ্নের জন্ম দেয়। আমাদের পূর্বসূরীদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের বিবেক বহু শোকগাথা রচনা করেছে।

পলাশীর আলোচনা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় ইংরেজদের ষড়যন্ত্র, তৎকালীন কিছু ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতা এবং নিজেদের দুর্ভাগ্যকে সামনে নিয়ে আসি। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, একটি জাতির বড় বিপর্যয় সাধারণত কোনো একটি দিনের ঘটনা বা কোনো এক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তৈরি হয় না। তার পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া কাজ করে।

সেই অর্থে পলাশীর পরাজয়কে শুধু ভাগ্যের বিপর্যয় হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত নানা দুর্বলতার একটি ভয়াবহ পরিণতি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সামাজিক বিভাজন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া—সবকিছু মিলেই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছিল।

পলাশীর বড় শিক্ষা হলো: কোনো জাতির পতন কেবল বাইরের ষড়যন্ত্রে ঘটে না; অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, বিভাজন, দূরদর্শিতার অভাব এবং জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্ছিন্নতাও একটি জাতিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

পলাশীর আগে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলায় আগমনের পর ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলার বিভিন্ন শাসক কখনো দিল্লির সুলতানদের আনুগত্য স্বীকার করেছেন, আবার কখনো স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করেছেন।

চতুর্দশ শতকে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের সময় বাংলার স্বাধীন সুলতানি শাসনের একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে ওঠে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বাংলা কখনো দিল্লির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, আবার কখনো স্বায়ত্তশাসনের অবস্থান ধরে রেখেছে। শেরশাহের শাসনামলে স্বল্প সময়ের জন্য বাংলা দিল্লির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার পরিবর্তিত হয়।

মুঘল সম্রাট আকবরের সময় বাংলাকে মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আনার প্রক্রিয়া জোরদার হয়। জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের সময় বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদ্যমান ছিল।

পরবর্তীকালে মুর্শিদ কুলি খানের নেতৃত্বে বাংলার প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা আরও স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে। তিনি ও তাঁর উত্তরসূরি নবাবরা আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করলেও বাংলার অভ্যন্তরীণ শাসনে তাদের স্বাধীনতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই অষ্টাদশ শতকে বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় বণিকদের প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে।

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলায় আগমন

বিশাল সম্পদ, উর্বর কৃষিভূমি এবং সমৃদ্ধ বাণিজ্যের কারণে বাংলা ইউরোপীয় বণিকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই আকর্ষণীয় ছিল। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬০০ সালে এবং পরবর্তী সময়ে তারা ভারতীয় উপমহাদেশে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিস্তৃত করতে থাকে।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় ইংরেজরা ভারতে বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করে। ১৬০৮ সালে সুরাটে তাদের বাণিজ্যিক উপস্থিতির সুযোগ তৈরি হয়। পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের দূত স্যার টমাস রো মুঘল দরবারে ইংরেজ বাণিজ্যের জন্য অধিকতর সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন।

সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইংরেজ চিকিৎসক গ্যাব্রিয়েল বাউটনের সঙ্গে মুঘল দরবারের একটি ঘটনা ইংরেজদের বাংলায় বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। সম্রাট শাহজাহানের কন্যার চিকিৎসা করে সুস্থ করার পর তিনি ব্যক্তিগত পুরস্কারের পরিবর্তে ইংরেজ বণিকদের জন্য বাণিজ্যিক সুবিধা প্রার্থনা করেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।

পরবর্তীকালে শাহ সুজার সময় ইংরেজরা বাংলায় বাণিজ্য করার আরও সুযোগ লাভ করে। হুগলিতে কুঠি স্থাপন এবং বিভিন্ন বন্দরে বাণিজ্যের সুযোগ তাদের কার্যক্রমকে ক্রমশ বিস্তৃত করে। প্রথমদিকে তাদের বাণিজ্যের পরিমাণ সীমিত থাকলেও কয়েক দশকের মধ্যে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

বাণিজ্য থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পথে

ইংরেজদের বাণিজ্যিক সুবিধা ক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পথ তৈরি করে। বিশেষ বাণিজ্যিক অধিকার নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোম্পানির সংঘাতও বাড়তে থাকে। আওরঙ্গজেবের সময় ইংরেজদের বিশেষ সুবিধা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে কোম্পানির সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সুবাদার শায়েস্তা খানের আমলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং এক পর্যায়ে তারা বাংলা থেকে বিতাড়িতও হয়। পরে ক্ষমা প্রার্থনা ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে তারা পুনরায় বাণিজ্যের সুযোগ লাভ করে। কোম্পানি পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পথ খুঁজতে থাকে।

সম্রাট ফাররুখসিয়ারের অসুস্থতার সময় ইংরেজ চিকিৎসক উইলিয়াম হ্যামিল্টনের চিকিৎসাসেবার ঘটনাও ইংরেজ বাণিজ্যিক সুবিধা বৃদ্ধির ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। চিকিৎসক ব্যক্তিগত পুরস্কারের পরিবর্তে ইংরেজ বণিকদের জন্য সুবিধা চেয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।

বাণিজ্যিক শক্তি যখন রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে শুরু করে, তখন পরিস্থিতির চরিত্র বদলে যায়। ইংরেজরা দুর্গ নির্মাণ, বাণিজ্যিক সুবিধার ব্যবহার এবং স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যায়।

শাসক ও সাধারণ মানুষের দূরত্ব

পলাশীর পটভূমি বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু নবাবের দরবার কিংবা সেনাপতিদের ভূমিকা দেখলে ইতিহাসের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। একটি রাষ্ট্রের শক্তি নির্ভর করে তার শাসক, প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং সাধারণ জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।

পলাশীর সময় বাংলার শাসকশ্রেণী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা—এমন ব্যাখ্যা ইতিহাসের একটি ধারায় পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষ, নিম্নবিত্ত শ্রেণী এবং জ্ঞানী-গুণী ও ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে নবাবি প্রশাসনের সম্পর্ক যদি আরও ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভিত্তিক হতো, তাহলে সংকটের সময় বৃহত্তর সামাজিক শক্তিকে একত্র করা সম্ভব হতে পারত।

কোনো জাতির কঠিন সময়ে সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমজীবী এবং পেশাজীবীদের সম্মিলিত শক্তিই রাষ্ট্রকে সংকট থেকে বের করে আনতে পারে। পলাশীর ক্ষেত্রে সেই সর্বব্যাপী সামাজিক ঐক্য অনুপস্থিত ছিল—এটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

সমাজ ও সংস্কৃতির অবক্ষয়ের প্রশ্ন

পলাশীর পটভূমি নিয়ে আলোচনায় সমাজ ও সংস্কৃতির অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। অষ্টাদশ শতকে বাংলার অভিজাত ও ধনিক শ্রেণীর একাংশের মধ্যে বিলাসিতা, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের যে চিত্র বিভিন্ন সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়, তা সমকালীন সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে।

সতেরো শতকের কবি আলাওলের রচনায় তৎকালীন নগর ও অভিজাত সমাজের জীবনযাত্রা, বিলাসিতা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশের নানা চিত্র পাওয়া যায়। এসব সাহিত্যিক বিবরণকে সমগ্র সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে না দেখে সমকালীন সমাজের কিছু প্রবণতার দলিল হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।

রাজনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে যখন নৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতা যুক্ত হয়, তখন একটি রাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতা কমে যেতে পারে। পলাশীর প্রেক্ষাপটেও এমন সামাজিক দুর্বলতা ছিল কি না, তা ইতিহাসবিদদের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একটি জাতির শক্তি শুধু তার অস্ত্রাগারে থাকে না; তার প্রকৃত শক্তি থাকে জ্ঞান, নৈতিকতা, ঐক্য, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদর্শী পরিকল্পনায়।

তবে কোনো একটি ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে দায়ী করার পরিবর্তে পলাশীর সময়কার সামাজিক বাস্তবতাকে বহুমাত্রিকভাবে দেখা প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অভিজাত গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব, ইউরোপীয় কোম্পানির কৌশল এবং বৃহত্তর সামাজিক বিভাজন—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

পলাশীর ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের আগে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মীর জাফর, জগৎ শেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে কোম্পানির যোগাযোগ ও গোপন সমঝোতা পলাশীর ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।

নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং ইংরেজ কোম্পানির রাজনৈতিক কৌশল একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। যুদ্ধের ময়দানে নবাবের পক্ষে থাকা বাহিনীর একটি বড় অংশ কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় থাকায় সিরাজউদ্দৌলার সামরিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

২৩ জুন ১৭৫৭ পলাশীর যুদ্ধের ফলাফল বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর পরিবর্তনের সূচনা করে। পলাশীর পর কোম্পানির প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পরবর্তী সময়ে বাংলার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হয়।

পলাশীর বিপর্যয় বোঝার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
১. ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক কৌশল ও সামরিক শক্তি।
২. বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই।
৩. বৃহত্তর সামাজিক ও প্রশাসনিক ঐক্যের দুর্বলতা।

পলাশীর সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা

পলাশীর যুদ্ধের পর আড়াই শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ইংরেজ শাসনের অবসান হয়েছে, ভারত বিভক্ত হয়েছে, বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু ইতিহাসের ঘটনা শুধু অতীত হয়ে থাকে না; তার কিছু মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিঘাত দীর্ঘদিন ধরে সমাজের মধ্যে প্রবাহিত হতে পারে।

এই অর্থে পলাশী আজও একটি প্রতীক। এটি আমাদের সামনে প্রশ্ন রাখে—আমরা কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছি? আমরা কি জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, অর্থনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ায় নিজেদের সক্ষমতা এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছি, যাতে বাইরের কোনো শক্তি আমাদের দুর্বলতাকে সহজে ব্যবহার করতে না পারে?

আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ, বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় নিজেই কোনো সমস্যা নয়। বরং জ্ঞান ও সংস্কৃতির পারস্পরিক বিনিময় একটি জাতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন অনুকরণ নিজস্ব সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে দুর্বল করে দেয়।

একইভাবে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম, অদক্ষতা ও সামাজিক অবিশ্বাস কোনো জাতির অগ্রগতির পথে বড় বাধা। আজকের পৃথিবীতে সামরিক শক্তির পাশাপাশি জ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান, নৈতিকতা ও মানবসম্পদই একটি দেশের প্রকৃত শক্তির অন্যতম ভিত্তি।

ইংরেজদের সাফল্য থেকে কী শেখা যায়?

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলায় ক্ষমতা বিস্তারের পদ্ধতি নৈতিকভাবে সমালোচনাযোগ্য হলেও তাদের সংগঠন, পরিকল্পনা, চিকিৎসাবিদ্যা, নৌ-প্রযুক্তি, বাণিজ্যিক দক্ষতা, তথ্য সংগ্রহ, কূটনীতি এবং রাজনৈতিক কৌশল বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়।

ইংরেজ চিকিৎসকদের মুঘল দরবারে চিকিৎসাসেবা এবং সেই সুযোগকে বৃহত্তর বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করার ঘটনাগুলো দেখায় যে ব্যক্তিগত দক্ষতাকে কীভাবে বৃহত্তর সংগঠনের স্বার্থে কাজে লাগানো হয়েছিল। ব্যক্তিগত সাফল্যকে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে রূপান্তর করার এই প্রবণতা আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজের জন্যও শিক্ষণীয়।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো—ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা শুধু অভিযোগ দিয়ে সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা, সংগঠন, তথ্য, দূরদর্শিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

পলাশী থেকে আমাদের শিক্ষা

পলাশীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতাশা নয়। ইতিহাসকে কেবল পরাজয়ের স্মৃতিতে পরিণত করলে তার প্রকৃত মূল্য পাওয়া যায় না। বরং ইতিহাসের ভুলগুলো চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের জন্য শক্তি তৈরি করাই ইতিহাসচর্চার উদ্দেশ্য।

একটি জাতিকে টিকে থাকতে হলে তাকে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উৎকর্ষ অর্জন করতে হয়। শিক্ষা ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হয়। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হয়। একই সঙ্গে সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়।

পলাশী আমাদের আরও শেখায় যে বিভক্ত সমাজ দুর্বল সমাজ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের জায়গায় বৃহত্তর ঐক্য অপরিহার্য। ধর্ম, শ্রেণী, পেশা কিংবা মতের পার্থক্য অতিক্রম করে একটি সমাজ যখন জ্ঞান, ন্যায়, দক্ষতা ও দেশের স্বার্থে একত্র হতে পারে, তখন তার শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

উপসংহার

পলাশীর ২৩ জুন ১৭৫৭ শুধু একটি যুদ্ধের তারিখ নয়; এটি বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই বিপর্যয়ের পেছনে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কৌশল যেমন ছিল, তেমনি ছিল বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই, প্রশাসনিক দুর্বলতা, সামাজিক দূরত্ব এবং বৃহত্তর ঐক্যের অভাব।

পলাশীর ইতিহাসকে শুধু মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের গল্প হিসেবে দেখলে ইতিহাসের গভীর শিক্ষা অধরা থেকে যায়। পলাশী আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে শেখায়। একটি জাতি তখনই অন্যের কৌশলের শিকার হয়, যখন তার নিজের ভেতরের দুর্বলতা সেই সুযোগ তৈরি করে দেয়।

আজকের বাঙালির প্রতি তাই ইতিহাসের দাবি—হতাশ না হয়ে শিক্ষা গ্রহণ করা। জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ক্রীড়া ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জন করা। আত্মমর্যাদাশীল, দক্ষ, জ্ঞানভিত্তিক ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ নির্মাণ করা।

পলাশীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হতে পারে তখনই, যখন তার পরাজয়ের স্মৃতি আমাদের দুর্বল করবে না; বরং জ্ঞান, দক্ষতা, ঐক্য, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তিতে পরিণত করবে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ঝরোকা পরিবারে আপনাকে স্বাগতম! অনুগ্রহ করে গঠনমূলক ও মার্জিত মন্তব্য করুন।;

comment url