প্রদোষকালে বাংলার গ্রাম ও নগর

মেটা ডেসক্রিপশন: সেন রাজাদের শাসনের শেষভাগ থেকে শুরু করে বখতিয়ার খলজীর আগমন, শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ উপাধি এবং আধুনিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত, প্রাচীন ও মধ্যযুগের সন্ধিক্ষণে (প্রদোষকালে) বাংলার গ্রাম, নগর, জলবায়ু, সমাজব্যবস্থা ও ভৌগোলিক বিবর্তনের এক বস্তুনিরপেক্ষ ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণ।

 


·       ভূমিকা ও ‘প্রদোষ’ শব্দটির সাহিত্যিক প্রেক্ষিত

বাংলা সাহিত্যে ‘প্রদোষ’ শব্দটির প্রয়োগ ও তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কথাশিল্পী শওকত আলী তাঁর বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর মাধ্যমে এই শব্দটিকে বাঙালি পাঠকমহলে এক বিশেষ মাত্রায় উপস্থাপন করেছেন।

 

‘প্রদোষ’ শব্দের অভিধানগত অর্থ হলো, সন্ধ্যার পূর্বাবস্থা, সূর্যাস্তকাল, সাঁঝের বেলা কিংবা গোধূলির আবছা আলো। অর্থাৎ, দিনের আলো মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকারের আগমন ঘটবার ঠিক আগের অস্পষ্ট আলোকময় মুহূর্তটিই হলো প্রদোষকাল।

 

উপন্যাসে শওকত আলী এই শব্দটির দ্বারা ঠিক কোন সময়টিকে বোঝাতে চেয়েছেন, তা উপন্যাসের পটভূমি ও তৎকালীন সময়কাল বিবেচনা করলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি দ্বাদশ শতকের শেষভাগে সেনবংশের সর্বশেষ প্রভাব বিস্তারকারী রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকালের অন্তিম মুহূর্তকে বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের ‘প্রদোষকাল’ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

 

ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিকদের মতে, এই সময়টি মানবজাতি বা সাধারণ প্রাকৃতজনের বসবাসের জন্য একেবারেই আরামপ্রদ বা সুখকর ছিল না। সামাজিক নিপীড়ন, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় পূর্ণ এই প্রদোষকালের ঠিক পরেই বাংলায় ঘটে এক যুগান্তকারী পটপরিবর্তন, ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর আগমন।

 

·       ইতিহাস, ভূগোল ও প্রকৃতির গভীর মেলবন্ধন

ইতিহাস কেবল রাজা-বাদশাহদের যুদ্ধবিগ্রহের কায়কারবার নয়; ইতিহাস সর্বদা প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলবায়ু এবং ভৌগোলিক অবস্থান দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। প্রকৃতিই হলো ইতিহাস নির্মাণের আসল ভিত্তিভূমি।

 

·       নদ-নদীর ভূমিকা ও জনপদের বিনাশ-বিকাশ

যুগ যুগে বাংলার প্রাকৃতিক পরিবেশ সমকালীন মানুষের জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। পলি বহনকারী নদীমালা বাংলার ইতিহাসের গতিধারা নির্ধারণ করেছে।

 

নগরের পতন ও উত্থান: গঙ্গা-ভাগীরথী, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, করতোয়া ও ব্রহ্মপুত্রের মতো প্রধান প্রধান নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে অতীতে বহু সমৃদ্ধ নগর-বন্দর, রাজধানী ও জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে জনমানবহীন বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে।

 

নতুন সভ্যতার সূচনা: নদীর প্রবাহ বদলে নতুন তীরের সৃষ্টি হলে সেখানে আবার গড়ে উঠেছে নতুন শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র। এভাবে প্রাচীন অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে বাংলার ইতিহাসে বারবার নতুন অধ্যায়ের সংযোজন ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, পুণ্ড্রনগর, ময়নামতি, দেবপর্বত, বিক্রমপুর ও সোনারগাঁওয়ের নাম উল্লেখ করা যায়, যা একসময় নদী ও ভূ-প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই সমৃদ্ধির চরম শিখরে পৌঁছেছিল।

 

                       [ নদীর গতিপথ পরিবর্তন ]

                                 

         ┌────────────────────────┴────────────────────────┐

                                                         

[ প্রাচীন নগর/রাজধানীর পতন ]                     [ নতুন শহর ও বন্দরের বিকাশ ]

 (যেমন: নদীগর্ভে বিলীন জনপদ)                      (যেমন: পুণ্ড্রনগর, সোনারগাঁও)

·       ভূ-বিজ্ঞানের চোখে ‘বঙ্গখাত’ ও বদ্বীপের উৎপত্তি

ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার একটা বিশাল অংশ একসময় গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল। প্রাচীনকালে সেই সমুদ্রের নাম ছিল ‘আসাম উপসর্গ’।

 

গিরিজনি আলোড়ন: ভূ-বিজ্ঞানী ইমুয়েসের মতে, গিরিজনি আলোড়নের প্রভাবে উত্তর দিকে গতিশীল দাক্ষিণাত্যের উত্তরাংশ অবনমিত হয়।

পলি সঞ্চয়: হিমালয় পর্বতমালা থেকে আসা নদীবাহিত পলি দীর্ঘকাল ধরে জমতে জমতে সেখানে একটি গোলাকার খাতের মতো প্লাবন সমভূমি গড়ে তোলে। ভূতত্ত্বের ভাষায় এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম অবতল ভূমি, যা ‘বঙ্গখাত’ নামে পরিচিত।

ভৌগোলিক সীমানা: এই বঙ্গখাতের উত্তরে রয়েছে শিলং মালভূমি, পশ্চিমে ভারতের সুদৃঢ় প্রাচীন ভূমি, পূর্বে নাগা-লুসাই ভাঁজ পর্বত এবং দক্ষিণ অংশ বঙ্গোপসাগরের গভীর তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

বাংলাদেশ মূলত এই বঙ্গখাতেরই বৃহত্তম অংশ। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জরিপ ও মাটি খুঁড়ে দেখা গেছে, এখানের পর্বতাঞ্চল ব্যাতীত বাকি সকল শিলা ও মাটিই প্রাচীন কিংবা নতুন পলি দ্বারা গঠিত।

 

·       প্রাচীন আবহাওয়া ও বৈদিক উল্লেখ

আজ থেকে প্রায় পঁচিশ কোটি বছর আগে পুরাজীবীয় (প্যালিওজোয়িক) যুগে এই অঞ্চলের আবহাওয়া বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ ও আর্দ্র ছিল। তখন এখানে প্রচুর গাছপালা জন্মাত এবং নানা প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল বলে অনুমান করা হয়।

যদিও সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের মতো চার হাজার বছর আগের সুনির্দিষ্ট প্রামাণ্য ঐতিহাসিক তথ্য কম, তবুও প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে ‘বঙ্গ’ ও সংলগ্ন অঞ্চলের উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, তৎকালীন সময়েও এখানে একটি সুসংগঠিত, উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল মানবসমাজ বাস করত। বৈদিক আর্যরা এই অধিবাসীদের সংস্কৃতি ও সভ্যতায় নিজেদের চেয়ে উন্নত বা স্বতন্ত্র দেখে তাদের প্রতি শত্রুত ভাবাপন্ন বা বিদ্বেষভাবাপন্ন ছিল।

 

·       প্রাচীন বাংলার প্রধান জনপদসমূহ

প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশ কখনোই একটি একক নামে বা একছত্র প্রশাসনিক প্রশাসনিক ইউনিটে পরিচিত ছিল না। সমগ্র ভূখণ্ডটি ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত ছিল, যেগুলোকে বলা হতো ‘জনপদ’।

 

                                [ প্রাচীন বাংলার জনপদ ]

                                          

 ┌──────────────┬───────────────────────────────────────────────────────────────┐

                                                                              

পুণ্ড্র        বঙ্গ           গৌড়                    রাঢ়           সমতট          হরিকেল

(বগুড়া/রংপুর) (ঢাকা/ফরিদপুর) (মালদহ/চাঁপাইনবাবগঞ্জ) (পশ্চিমবঙ্গ)    (কুমিল্লা/চাঁদপুর) (সিলেট/চট্টগ্রাম)

পুণ্ড্র ও পুণ্ড্রবর্ধন (বরেন্দ্রী)

প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে উন্নত ও প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক জনপদ ছিল পুণ্ড্র। বর্তমান বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের কিয়দংশ নিয়ে এটি গঠিত ছিল।

 

পুণ্ড্রনগর: বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৮ মাইল উত্তরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘মহাস্থানগড়’-ই ছিল প্রাচীন পুণ্ড্রনগর।

 

প্রশাসনিক বিবর্তন: মৌর্য ও গুপ্ত আমলে এটি ‘পুণ্ড্রবর্ধনভুক্ত’ বা প্রশাসনিক ইউনিটে পরিণত হয়। পরবর্তীতে পাল আমলে (দশম শতকে) কবি সন্ধাকর নন্দীর ‘রামচরিতম’ কাব্যে এবং একাধিক তাম্রশাসনে এই অঞ্চলকে ‘বরেণ্দ্রী’ বা ‘বরেন্দ্রমণ্ডল’ (পিতৃভূমি) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মুসলিম শাসনে এটি ‘বরিন্দ’ বা ‘বরেণ্ড’ জনপদে রূপ নেয়।

 

বঙ্গ জনপদ

দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার নদীবেষ্টিত অঞ্চল, অর্থাৎ বর্তমান ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, এবং নিম্ন সমতল এলাকা নিয়ে প্রাচীন বঙ্গ গঠিত ছিল।

 

বৈশিষ্ট্য: কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র-এ বঙ্গের "শ্বেতস্নিগ্ধ" কার্পাস বস্ত্রের ব্যাপক প্রশংসা রয়েছে। এছাড়া মহাকবি কালিদাসের রঘুবংশম কাব্যে বঙ্গের শক্তিশালী নৌ-বাহিনীর বিবরণ পাওয়া যায়।

 

গৌড় জনপদ

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকা ছিল গৌড়ের কেন্দ্রস্থল।

একক সত্তা গঠন: সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্ক পুণ্ড্রবর্ধন, গৌড়, দক্ষিণবঙ্গ ও উড়িষ্যা জয় করে ‘গৌড়’ নামে প্রথম একটি একক শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তোলেন। তাঁকে হর্ষচরিত-এ ‘গৌড়েশ্বর’ বলা হয়েছে। এরপর থেকে পাল ও সেন রাজারা বাংলাজুড়ে শাসন করলেও নিজেদের ‘গৌড়েশ্বর’ ভাবতেই বেশি গর্ব বোধ করতেন।

 

রাঢ়, সূহ্ম ও তাম্রলিপ্ত

রাঢ় ও সূহ্ম: ভাগীরথী নদীর পশ্চিমে অবস্থিত লাল মাটির পাহাড়ি এলাকা (উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ়)।

তাম্রলিপ্ত: এটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নৌ-বাণিজ্য বন্দর ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি-শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল।

সমতট ও হরিকেল

সমতট: মেঘনা নদীর পূর্বাঞ্চল—অর্থাৎ বর্তমান কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর ও ত্রিপুরা অঞ্চল।

হরিকেল: ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বপূর্ব সীমান্তে অবস্থিত বর্তমান সিলেট (শ্রীহট্ট) ও চট্টগ্রাম অঞ্চল।

অন্যান্য ক্ষুদ্র জনপদ

চন্দ্রদ্বীপ: বর্তমান বরিশাল, পটুয়াখালী ও সংলগ্ন দ্বীপাঞ্চল।

উপবঙ্গ: যশোর ও সুন্দরবনের নিম্নাঞ্চল।

ভৌগোলিক সীমানা ও ঐতিহাসিক 'গঙ্গারিডি'

ইতিহাসবিদ নিহাররঞ্জন রায়ের মতে, হিমালয় থেকে নেমে আসা নদী, পূর্বে ত্রিপুরা-লুসাই পাহাড়, পশ্চিমে রাজমহল-ছোটনাগপুরের পাহাড়ি ভূমি এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী সমভূমিই হলো বাঙালির ভৌগোলিক ভাগ্যের রূপরেখা।

পরাক্রমশালী ‘গঙ্গারিডি’ রাজ্য

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে বীর আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময়ে গ্রীক ঐতিহাসিকদের (মেগাস্থানিস ও ডিওডোরাস) লেখায় গঙ্গা নদীর মোহনায় অবস্থিত ‘গঙ্গারিডি’ (Gangaridai) রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই রাজ্যের সুবিশাল হস্তীবাহিনী, পদাতিক সৈন্য এবং অসীম সামরিক শক্তির কথা শুনে আলেকজান্ডারের বিজয়ী সেনাবাহিনী এতই ভীত হয়ে পড়েছিল যে, তারা বিয়াস (ব্যাস) নদীর তীর থেকেই গ্রীসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রাচীন সাহিত্য ও ধর্মগ্রন্থে বাংলার অন্বেষণ

বাংলার নাম ও জনপদের উল্লেখ প্রাচীন একাধিক ধর্মীয় ও সাহিত্যিক গ্রন্থে পাওয়া যায়:

ঐতরেয় আরণ্যক: ঋগ্বেদের এই গ্রন্থে সর্বপ্রথম সুনির্দিষ্টভাবে ‘বঙ্গ’ শব্দের উল্লেখ মেলে।

বোধায়ন ধর্মসূত্র: আর্য সংস্কৃতির বাইরে থাকায় প্রাচীনকালে এই বঙ্গ অঞ্চলে বৈদিক আর্যরা সফর করলে তাদের প্রায়শ্চিত্ত বা অনুশোচনা করার বিধান দেওয়া হয়েছিল।

রামায়ণ ও মহাভারত: মহাভারতের আদিপর্ব ও সভাপর্বে ভীমের পূর্বদিগ্বিজয় পর্বে বঙ্গ ও পুণ্ড্ররাজের সাথে যুদ্ধের বিবরণ রয়েছে।

·       প্রদোষকালে বাংলার গ্রাম ও নগরের বৈপরীত্য

প্রদোষকালে (দ্বাদশ শতকে) বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক জীবন গ্রামের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছিল।

 

·       গ্রামীণ জীবন ও কুটিরশিল্প

বাংলার গ্রামগুলো ছিল সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর ও ক্ষুদ্র কায়িকশিল্প কেন্দ্রিক।

 

উৎপাদন ও পেশা: গ্রামে কৃষকের পাশাপাশি নানা পেশার মানুষ বাস করত, যেমন কামার, কুমোর, মালাকার, চিত্রকর, তেলী, ছুতোর (সূত্রধর), তাঁতি ও কাঁসারি।

 

কুটিরশিল্প: সুতা কাটা, তুলা ধোনা, বাঁশ-বেতের পাত্র তৈরি এবং হস্তিদাঁতের শিল্প ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির মূল উৎস। দরিদ্র ব্রাহ্মণ গৃহস্থ বাড়ির মেয়েরাও সুতা কাটার কাজ করতেন।

 

গ্রামের শ্রেণিভেদ: ছোট ছোট গ্রামকে ‘বাটক’ বা ‘পাটক’ বা ‘পাড়া’ বলা হতো (যেমন: নিবৃত্ত-বাটক, শাল্মলী-বাটক)। বড় ও উন্নত সুবিধাভোগী গ্রামগুলোর মধ্যে বল্লাল সেনের নাইহাটী লিপির ‘বল্লহিট্টা’, লক্ষ্মণসেনের গোবিন্দপুর লিপির ‘বিড়ালশাসন’ এবং তর্পণদীঘি লিপির ‘বেলহিষ্টি’ গ্রামের নাম উল্লেখযোগ্য।

 

·       নগর জীবন ও বৈভব

গ্রাম যেখানে উৎপাদন করত, নগর বা শহর ছিল সেই উৎপাদিত সম্পদের প্রধান ভোক্তা।

 

নগরের গঠন: শহর গড়ে উঠত প্রশাসনিক কেন্দ্র, রাজপ্রাসাদ, বিচারালয়, সামরিক দপ্তর, ট্যাকশাল (টাকশাল), বড় বড় হাটবাজার, নদীবন্দর বা তীর্থস্থানকে কেন্দ্র করে।

 

অধিবাসী: শহরের অধিবাসীরা ছিলেন মূলত রাজা-মহারাজা, সামন্ত, রাজকর্মচারী, ধনী বণিক (শ্রেষ্টী), সুবর্ণবণিক, গন্ধবণিক এবং উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণগণ।

 

শহরের সেবা প্রদানকারী শ্রেণি: শহরের বিত্তশালীদের সেবা দেওয়ার জন্য ধোপা, নাপিত, গোয়ালা, এবং ডোম, চণ্ডাল, কসাই, চামারের মতো নিম্নবর্ণের মানুষরা শহরের উপকণ্ঠে বা বাইরে (‘ডোম্বীর কুড়িয়া’) বসবাস করত।

 

·       চরম অর্থনৈতিক ও ভোগবাদী বৈষম্য

তৎকালীন কবিদের রচনা (যেমন: পবনদূত, রামচরিত, সদুক্তিকর্ণামৃত) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

 

শহরে: বহুতল প্রাসাদ, নর-নারীর সোনা-দানার প্রাচুর্য, বারাঙ্গনাদের দাপট এবং পরম ভোগ-বিলাসিতা।

 

গ্রামে: দিনমজুর ও কৃষকদের চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা, অভাব ও জীর্ণ জীবনের হাহাকার। গ্রামের উৎপাদিত সম্পদ দিয়েই শহরের বিলাসিতা চলত, অথচ উৎপাদকদের নিজেদের কোনো সামাজিক অধিকার ছিল না।

 

·       সেন আমলের সামাজিক অবক্ষয় ও তুর্কি বিজয়

১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে রাজা লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত করে নদীয়া ও লক্ষণাবতী (গৌড়) জয় করেন। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল সেন আমলের অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়ের অনিবার্য পরিণতি।

 

·       সামাজিক জরা ও ব্রাহ্মণবাদের অত্যাচার

সেন আমলে (বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণসেনের সময়) বাংলায় কঠোর কৌলিন্য প্রথা ও বর্ণবাদ চাপিয়ে দেওয়া হয়।

অনৈক্য ও ঘৃণা: উঁচুতলা ও নিচুতলার মানুষের ভেদাভেদ, অনাস্থা ও ঘৃণা সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দিয়েছিল।

সাহিত্যে নৈতিক অধঃপতন: রাজসভার সাহিত্য ও কবিতাগুলোতে কেবল দেহগত বিলাসিতা, লালসা ও লম্পটতার চিত্র ছিল।

অধ্যাপক অতীন্দ্র মজুমদারের মতে: তৎকালীন বাংলা চরম আত্মসন্তোষ, দুর্বল আত্মশক্তি এবং ক্ষীয়মাণ নৈতিকতায় ধ্বংসের দিকে যাচ্ছিল। অনাহারী ও শোষিত সাধারণ মানুষ যেন এক অন্ধকারের কঠোর পেশণে তিলে তিলে কাঁদছিল।

ইতিহাসবিদ ড. নিহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙালীর ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন:

"একটি বৃহৎ গভীর ব্যাপক সামাজিক বিপ্লবের ভূমি পড়িয়াই ছিল। কিন্তু কেহই তাহার সুযোগ গ্রহণ করে নাই। মুসলমানরা না আসিলে কিভাবে কি উপায়ে কি হইত বলিবার উপায় নাই।"

এই সামাজিক ও মানসিক প্রেক্ষাপটেই সাধারণ প্রাকৃতজন বখতিয়ার খলজীর আগমনকে সানন্দে স্বাগত জানায় এবং বাংলায় এক নতুন শান্তির সকালের সূচনা ঘটে।

·       ইলিয়াস শাহী আমল: ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

মুসলিম শাসনের সূচনার পর বাংলা আর দিল্লির অনুগত প্রদেশ মাত্র থাকেনি।

·       অখণ্ড বাংলার নির্মাতা: শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ

১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতির সিংহাসনে বসে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ্ সোনারগাঁও, সাতগাঁও ও সমগ্র বঙ্গ একক প্রশাসনিক ছাতার নিচে নিয়ে আসেন।

তিনি নিজেকে "শাহ-ই-বাঙালিয়ান" (বাঙালিদের রাজা) এবং "সুলতান-ই-বাঙালা" উপাধিতে ভূষিত করেন।

তিনিই ইতিহাসে প্রথম বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে একত্রিত করে অখণ্ড ‘বাঙ্গালা’ রাষ্ট্রের জন্ম দেন।

ভাষা ও সাহিত্যের স্বর্ণযুগ

সুলতানী আমলে বাংলা ভাষা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। যে ভাষাকে সেন আমলে অপাঙ্ক্তেয় মনে করা হতো, সেই বাংলায় রামায়ণ, মহাভারত অনূদিত হয় এবং চণ্ডীদাস, শাহ মুহম্মদ সগীর, কৃত্তিবাসের মতো কবিরা রাজদরবারে সম্মানিত হন।

·       'বঙ্গ' থেকে 'বাংলাদেশ': নামের বিবর্তন

সম্রাট আকবরের আমলে তাঁর বিখ্যাত সভা-ইতিহাসবিদ আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে 'বাঙ্গালা' নামের বুৎপত্তি দিয়ে লিখেছেন:

"এ দেশের মূল নাম ছিল ‘বঙ্গ’। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা বন্যা থেকে ফসল রক্ষা করতে জমিতে ১০ হাত উঁচু ও ২০ হাত প্রশস্ত ‘আল’ (বাঁধ) তৈরি করত। ফলে বঙ্গ + আল যুক্ত হয়ে ‘বঙ্গাল’ বা ‘বাঙ্গালা’ শব্দের উৎপত্তি হয়।"

 [ প্রাচীন বঙ্গ ] ──(বাঁধ/আল যুক্ত হয়ে)──► [ বঙ্গাল / বাঙ্গালা ] ──(পর্তুগিজ ও ইংরেজি রূপান্তর)──► [ Bengal ] ──(১৯৭১)──► [ স্বাধীন বাংলাদেশ ]

ভাষাতাত্ত্বিক রূপান্তর: ইতিহাসবিদ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ও সুকুমার সেনের মতে, মুসলিম আমলে ‘বাঙ্গালাহ্’ (Bangalah) শব্দ থেকে পর্তুগিজরা তৈরি করে ‘বেঙ্গালা’ (Bengala)। ইংরেজরা সেখান থেকে বলে ‘বেঙ্গল’ (Bengal)।

চূড়ান্ত রূপ: এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের ধারায় ১৯৭১ সালে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে এই ভূখণ্ডের একটি অংশ ‘বাংলাদেশ’ নামে বিশ্ব মানচিত্রে রক্তিম সূর্য ও সবুজ পতাকার স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

·       উপসংহার

প্রদোষকালের সেই অস্পষ্ট আঁধার, সেন আমলের সামাজিক বৈষম্যের করুণ কন্দন, আর তুর্কি বিজয়ের পর থেকে শুরু হওয়া অখণ্ড জাতীয়তাবাদের বিকাশ, সব মিলে বাংলার ইতিহাস এক মহাকাব্যিক পথচলা। নদীবিচ্ছিন্ন প্রাচীন জনপদ থেকে শুরু করে ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’-এর প্রশাসনিক ঐক্য এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশ, বাঙালির ভৌগোলিক ভাগ্য ও সংস্কৃতি শত সহস্রাব্দের এই বিবর্তনের মধ্য দিয়েই আজকের চিরস্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করেছে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ঝরোকা পরিবারে আপনাকে স্বাগতম! অনুগ্রহ করে গঠনমূলক ও মার্জিত মন্তব্য করুন।;

comment url