কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ গানে প্রেম, প্রকৃতি ও কল্পনার অপূর্ব গীতিকাব্য

কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ গানে প্রেম, প্রকৃতি ও কল্পনার অপূর্ব গীতিকাব্য

বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের বিশাল পরিসরে কাজী নজরুল ইসলাম এক বহুমাত্রিক স্রষ্টা। তাঁকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ পরিচয়ে আবদ্ধ করলে তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তার একটি বড় অংশ অনালোচিত থেকে যায়। 

যে কবি অন্যায়, শোষণ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন বিদ্রোহের বাণী, সেই কবিই আবার প্রেম, সৌন্দর্য, বিরহ, আকুলতা ও মানবিক অনুভূতির অসামান্য গীতিকার। তাঁর কবিতা ও গানে একই সঙ্গে ধ্বনিত হয়েছে বিদ্রোহের রণতূর্য এবং প্রেমের বাঁশরি।

মোর প্রিয়া হবে এসো রানী থিম সঙ...

নজরুলের প্রেমের গানগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর কল্পনার ব্যাপ্তি। তিনি প্রেমকে কেবল দুজন মানুষের ব্যক্তিগত আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং প্রকৃতি, ঋতু, আকাশ, চাঁদ, মেঘ, রামধনু, পাখি, ফুল ও সুরের সঙ্গে প্রেমকে একাকার করেছেন। 

*    কবির প্রেমিক কেবল প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে থাকেন না; সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতিকে যেন প্রেয়সীর সৌন্দর্যের অলংকার হিসেবে আবিষ্কার করেন।

এই নন্দনচেতনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ কাজী নজরুল ইসলামের জনপ্রিয় নজরুলগীতি ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’। গানটির প্রথম পঙক্তি,‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’,একটি সাধারণ প্রেমের আহ্বান দিয়ে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই গানটি বাস্তব জগতের সীমা অতিক্রম করে এক কল্পলোক নির্মাণ করে। সেখানে তারার ফুল হয়ে ওঠে খোঁপার অলংকার, চৈতী চাঁদ হয়ে ওঠে কানের দুল, হংসসারি হয়ে ওঠে মালিকা, বিদ্যুৎ হয়ে ওঠে চুল বাঁধার ফিতা, চাঁদের আলো মিশে যায় চন্দনের সঙ্গে এবং রামধনু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসে আলতার রং।

 

অর্থাৎ, প্রেমিক এখানে শুধু ভালোবাসার কথা বলছেন না; তিনি একটি সম্পূর্ণ সৌন্দর্যজগৎ নির্মাণ করছেন।

 

গানটির সংগীত-তথ্যসূত্রে তাল হিসেবে দাদরা উল্লেখ পাওয়া যায়। নজরুলগীতি-সংগ্রহে গানটির বাণী ও দাদরা তাল নথিভুক্ত রয়েছে; রাগের ঘরটি সেখানে নির্দিষ্টভাবে পূরণ করা হয়নি। তাই পিলু বা খাম্বাজের মতো কোনো নির্দিষ্ট রাগকে এই গানের নিশ্চিত রাগ হিসেবে উল্লেখ করার পরিবর্তে গানের সুরের আবেগ, লয় ও গীতিধর্মী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করাই অধিক নির্ভরযোগ্য।

 

গানটির মূল সৌন্দর্য: প্রেমের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির মিলন

 

‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ গানটির সবচেয়ে বড় শক্তি তার চিত্রকল্প। নজরুল এখানে প্রচলিত অলংকারের ব্যবহার করেননি শুধু সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য; তিনি প্রকৃতির বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলোকে একত্র করে একটি কল্পিত প্রেমলোক নির্মাণ করেছেন।

 

প্রেয়সীকে সাজাতে কবির প্রয়োজন নেই সোনা, রুপা, মুক্তা কিংবা দামি অলংকারের। তাঁর কাছে আকাশই অলংকারের ভাণ্ডার। নক্ষত্র ফুল হয়ে যায়, চাঁদ হয়ে যায় দুল, হংসসারি হয়ে যায় মালা, বিদ্যুৎ হয়ে যায় ফিতা, মেঘ হয়ে যায় চুলের রং, জোছনা হয়ে যায় প্রসাধন এবং রামধনু হয়ে ওঠে আলতার উৎস।

 

এই কল্পনার মধ্যেই নজরুলের কবিসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে,তিনি দৃশ্যমান জগতকে নতুন অর্থে দেখতে পারেন।

 

যে চাঁদ প্রতিদিন আকাশে দেখা যায়, প্রেমিকের কল্পনায় সেটিই হয়ে ওঠে প্রেয়সীর কানের দুল। যে তারাগুলো অসীম আকাশে দূরবর্তী আলোকবিন্দু, সেগুলোই কবির চোখে খোঁপার ফুল। প্রকৃতির কোনো উপাদান আর তার নিজস্ব অবস্থানে থাকে না; প্রেমের আবেগ তাকে নতুন পরিচয় দেয়।

 

এ কারণেই গানটি নিছক প্রেমের গান নয়। এটি একই সঙ্গে একটি প্রকৃতি-নির্ভর কল্পকাব্য।

 

‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’: একটি রাজকীয় প্রেমের আহ্বান

গানের শুরুতেই আছে,

‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’

এই একটি বাক্যের মধ্যেই গানের আবেগের কাঠামো তৈরি হয়ে যায়।

‘প্রিয়া’ শব্দটি ব্যক্তিগত প্রেমের পরিচয় বহন করে, আর ‘রানী’ শব্দটি সেই প্রেমকে রাজকীয় মর্যাদা দেয়। প্রেমিক তাঁর প্রেয়সীকে নিজের জীবনের সাধারণ কোনো মানুষ হিসেবে দেখতে চান না; তিনি তাঁকে একটি বিশেষ আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

এখানে ‘রানী’ কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক নয়। এটি প্রেমিকের দৃষ্টিতে প্রেয়সীর মর্যাদার প্রতীক। প্রেমিকের কল্পনার রাজ্যে প্রেয়সীই সর্বোচ্চ সৌন্দর্যের অধিকারিণী।

 

এই দৃষ্টিভঙ্গি নজরুলের প্রেমের নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর প্রেমগানে নারীকে কেবল আকর্ষণের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতার পাশাপাশি সৌন্দর্য, সৃষ্টিশীলতা ও অনুভূতির কেন্দ্র হিসেবেও দেখা যায়। ফলে প্রেয়সী এখানে শুধু ‘যাকে ভালোবাসা হয়’ এমন একজন নন; তিনি পুরো কল্পনাজগতের কেন্দ্রবিন্দু।

 

প্রথম চিত্রকল্প: তারার ফুল ও চৈতী চাঁদের দুল

গানের পরবর্তী অংশে প্রেমিকের কল্পনা আরও বিস্তৃত হয়। প্রেয়সীর খোঁপার জন্য তিনি চান তারার ফুল, আর কর্ণের অলংকার হিসেবে কল্পনা করেন চৈতী চাঁদের দুল।

 

এখানে দুটি ভিন্ন মহাজাগতিক উপাদানকে নারীর সাজসজ্জার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে,তারা এবং চাঁদ।

 

তারাকে ফুলের সঙ্গে তুলনা করা বাংলা কাব্যে সম্পূর্ণ নতুন নয়, কিন্তু নজরুলের ব্যবহারে এটি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করেছে। কারণ তিনি শুধু তারাকে ফুলের সঙ্গে তুলনা করেই থেমে থাকেননি; তিনি যেন সেই তারাগুলো সংগ্রহ করে প্রেয়সীর খোঁপায় পরিয়ে দিতে চান।

 

অর্থাৎ, উপমা এখানে কেবল বর্ণনার মাধ্যম নয়; এটি প্রেমিকের অসীম আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।

 

বাস্তব জগতে আকাশের তারা হাতে তুলে নেওয়া অসম্ভব। কিন্তু কবিতার জগতে অসম্ভবই সম্ভব। প্রেমিকের ভালোবাসা যত গভীর, তার উপহারও তত অসীম।

 

চৈত্রের চাঁদকে কানের দুল হিসেবে কল্পনা করার মধ্যেও রয়েছে সূক্ষ্ম সৌন্দর্যবোধ। ‘তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদ’ পূর্ণচন্দ্র নয়; বরং সূক্ষ্ম, বাঁকা, কোমল চাঁদ। কানের দুলের সঙ্গে তার আকৃতিগত মিল আছে। ফলে এখানে উপমা যেমন আছে, তেমনি আছে আকৃতিগত রূপান্তর।

 

চাঁদ আর চাঁদ থাকে না; প্রেমিকের কল্পনায় তা হয়ে ওঠে অলংকার।

হংসসারি থেকে মালিকা: গতির মধ্যে সৌন্দর্য

গানের পরবর্তী চিত্রকল্পে আসে হংসসারি।

 

হংসের সারি আকাশে বা জলের ওপর চলমান একটি দৃশ্য। একে ‘মালিকা’ হিসেবে কল্পনা করার ফলে দৃশ্যটির মধ্যে শুধু সৌন্দর্য নয়, গতিও যুক্ত হয়।

 

মালা সাধারণত স্থির। কিন্তু হংসসারি চলমান। ফলে ‘দুলানো মালিকা’ কল্পনাটির মধ্যে একটি চলমান সৌন্দর্যের অনুভূতি তৈরি করে।

এখানে নজরুলের চিত্রকল্প স্থির ছবি নয়; তা যেন একটি চলমান দৃশ্যপট।

 

প্রেয়সীর কণ্ঠে মালা পরানো হচ্ছে,কিন্তু সেই মালার উপাদান ফুল নয়, আকাশে বা প্রকৃতিতে চলমান হংসসারি। ফলে নারীর অলংকার প্রকৃতির গতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

 

এই জায়গায় নজরুলের কবিসত্তার একটি বিশেষ দিক ধরা পড়ে: তিনি সৌন্দর্যকে স্থির বস্তু হিসেবে নয়, চলমান অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেছেন।

 

মেঘরঙা চুল ও বিজলির ফিতা

প্রেয়সীর চুলকে কবি দেখেছেন মেঘের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। ‘মেঘ রঙ এলো চুল’,এই চিত্রকল্পে চুলের কালো, ঘন, এলোমেলো সৌন্দর্য প্রকৃতির বর্ষামেঘের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

 

কিন্তু শুধু মেঘ দিয়ে চিত্রটি সম্পূর্ণ হয় না। সেই চুল বাঁধার জন্য প্রয়োজন ফিতা। আর সেই ফিতাও সাধারণ কোনো ফিতা নয়,বিজলির জরীণ ফিতা।

এখানে দুটি বিপরীত প্রকৃতির উপাদান একত্রিত হয়েছে।

একদিকে মেঘ,গভীর, কালো, স্থির ও ভারী।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ,উজ্জ্বল, ক্ষণস্থায়ী, গতিশীল ও দীপ্তিমান।

এই দুইয়ের মিলনে তৈরি হয়েছে এক অসাধারণ দৃশ্যকল্প। কালো মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের ঝলক যেমন আকস্মিক আলো সৃষ্টি করে, তেমনি কালো চুলের মধ্যে ঝলমলে ফিতার কল্পনাও সৌন্দর্যের বৈপরীত্য তৈরি করে।

এখানে আলো ও অন্ধকারের বৈপরীত্য প্রেমের নন্দনতত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।

 

জোছনা ও চন্দন: স্পর্শ, সুবাস ও আলোর সম্মিলন

 

গানের অন্যতম কোমল চিত্রকল্প হলো জোছনার সঙ্গে চন্দন মিশিয়ে প্রেয়সীর শরীরে মাখিয়ে দেওয়ার কল্পনা।

 

চন্দন একটি স্পর্শ ও সুবাসের বিষয়। জোছনা একটি দৃশ্য ও আলোর বিষয়।

নজরুল এই দুই ভিন্ন ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতাকে একত্র করেছেন।

চন্দনের সুবাস ও শীতলতা এবং জোছনার কোমল আলো,দুটির মিলনে তৈরি হয়েছে একটি প্রায় অলৌকিক প্রসাধন।

এখানে কবির কল্পনা শুধু চোখে দেখা সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দৃষ্টি, স্পর্শ ও ঘ্রাণ,তিনটি ইন্দ্রিয়কে একত্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ নান্দনিক অনুভূতি তৈরি করেছেন।

এ ধরনের ইন্দ্রিয়-সমন্বিত চিত্রকল্প গানের আবেগকে আরও গভীর করে।

 

রামধনু থেকে আলতার লাল

প্রেয়সীর পায়ের জন্য কবি যে আলতা কল্পনা করেছেন, সেটিও সাধারণ আলতা নয়। তিনি রামধনু থেকে লাল রং ছেঁকে নিয়ে তা দিয়ে প্রেয়সীর পা সাজাতে চান।

এখানে রামধনু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

রামধনু প্রকৃতির বহু রঙের সমন্বয়। কিন্তু কবি সেই বহুরঙা রামধনু থেকে কেবল লাল রংটি বেছে নিচ্ছেন। কারণ আলতার সঙ্গে লালের সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক সম্পর্ক গভীর।

লাল এখানে শুধু রং নয়; এটি প্রেম, আকর্ষণ, উষ্ণতা, যৌবন ও সৌন্দর্যেরও প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই চিত্রকল্পের মধ্যে আবার একটি অসম্ভব কাজের কল্পনা রয়েছে। রামধনু থেকে কোনো একটি রং আলাদা করে নেওয়া যায় না। কিন্তু কবির প্রেমের জগতে সেটিই সম্ভব।

 

ফলে গানটির প্রতিটি অলংকার আসলে একটি করে অসম্ভবকে সম্ভব করার কবিসুলভ প্রয়াস।

সাত সুরে বাসর: গানটির সবচেয়ে গভীর নন্দনতাত্ত্বিক স্তর-

 

গানের শেষাংশে এসে নজরুল তাঁর কল্পনাকে প্রকৃতি থেকে নিজের শিল্পসত্তার দিকে নিয়ে আসেন।

তিনি আর আকাশ থেকে ফুল, চাঁদ কিংবা রামধনু সংগ্রহ করছেন না। এবার তাঁর নিজের সম্পদ সামনে আসে,গানের সাত সুর।

 

এই জায়গাটি পুরো গানটির কাঠামোগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রথমে ছিল প্রকৃতি।

তারপর ছিল প্রেয়সীর শরীর ও সাজসজ্জা।

শেষে এসে সেই প্রকৃতি ও সৌন্দর্যকে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

 

‘সাত সুর’ বলতে ভারতীয় সংগীতের প্রচলিত সাতটি স্বর,সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি,বোঝানো যায়। কিন্তু এখানে এগুলো নিছক সংগীততাত্ত্বিক স্বর নয়। কবির কল্পনায় এগুলো হয়ে উঠেছে প্রেমের বাসর নির্মাণের উপকরণ।

 

অর্থাৎ, প্রেমিকের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার বস্তুগত সম্পদ নয়; নিজের সৃষ্টিশীলতা।

 

তিনি প্রেয়সীর জন্য একটি গয়না বানাতে পারেন না, কিন্তু গান বানাতে পারেন। তিনি আকাশের তারা সত্যিই এনে দিতে পারেন না, কিন্তু তারাকে ফুলে রূপান্তরিত করার মতো কল্পনা করতে পারেন। তিনি রামধনু থেকে লাল রং আলাদা করতে পারেন না, কিন্তু কবিতায় তা সম্ভব করে তুলতে পারেন।

 

এই জায়গাতেই প্রেমিক নজরুল এবং শিল্পী নজরুল এক হয়ে যান।

‘কবিতার বুলবুল’: শিল্পসত্তার প্রতীক

গানের শেষ চিত্রকল্পে আসে বুলবুল।

 

বাংলা ও ফারসি-উর্দু কাব্যপরম্পরায় বুলবুল একটি অত্যন্ত পরিচিত পাখি-প্রতীক। ফুলের সঙ্গে বুলবুলের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বুলবুল অনেক সময় প্রেমিক, গায়ক বা আকুল হৃদয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

নজরুলের গানে ‘কবিতার বুলবুল’ শব্দবন্ধটি তাই বহুমাত্রিক।

 

এখানে বুলবুল যেন কবির নিজের কবিসত্তা। কবি নিজে হয়তো নীরব, কিন্তু তাঁর কবিতা গান হয়ে প্রেয়সীকে ঘিরে গাইতে থাকবে।

 

অর্থাৎ, প্রেমিকের শরীর একদিন থাকবে না, বস্তুগত উপহারও নষ্ট হয়ে যাবে, কিন্তু শিল্পের সৃষ্টি টিকে থাকতে পারে।

 

এই দৃষ্টিকোণ থেকে গানের শেষাংশকে শুধু প্রেমের সমাপ্তি হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটিকে শিল্পের অমরত্বের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা যায়।

গানের চিত্রকল্প: একটি পূর্ণাঙ্গ নান্দনিক মানচিত্র

গানটির চিত্রকল্পগুলো আলাদাভাবে দেখলে আমরা পাই,

তারা ফুল
চাঁদ দুল
হংসসারি মালিকা
মেঘ চুল
বিজলি ফিতা
জোছনা প্রসাধন
রামধনু আলতার রং
সাত সুর বাসরঘর

বুলবুল কবিতার কণ্ঠ

 

এই রূপান্তরগুলোই গানটির অন্তর্নিহিত নন্দনতত্ত্বকে নির্মাণ করেছে।

প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান এখানে তার স্বাভাবিক পরিচয় হারিয়ে প্রেমের নতুন পরিচয় লাভ করেছে।

এটিই গানটির সবচেয়ে বড় কাব্যিক সাফল্য।

রূপক, উপমা ও চিত্রকল্পের ব্যবহার

গানটির ভাষায় উপমা ও রূপকের পাশাপাশি রয়েছে রূপান্তরমূলক চিত্রকল্প।

 

যেমন, তারাকে সরাসরি ফুল বলা হচ্ছে না শুধু; বরং তাকে এমনভাবে কল্পনা করা হচ্ছে যেন তা সত্যিই খোঁপায় পরানো সম্ভব। চাঁদকে শুধু দুলের সঙ্গে তুলনা করা হয়নি; তাকে দুল হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।

 

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।

উপমা সাধারণত বলে,একটি বস্তু অন্যটির মতো।

কিন্তু রূপক বা কল্পনামূলক রূপান্তরে বস্তুটি যেন সাময়িকভাবে নিজের পরিচয় বদলে ফেলে।

নজরুলের এই গানে সেই রূপান্তর বারবার ঘটেছে।

 

ফলে গানটি শুনতে শুনতে শ্রোতা বাস্তব পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে একটি স্বপ্নময় জগতে প্রবেশ করেন।

 

শব্দের সুর ও অন্ত্যমিল

গানটির বাণী শুধু অর্থের কারণে শ্রুতিমধুর নয়; শব্দের বিন্যাসও তার সংগীতধর্মিতা বাড়িয়েছে।

‘ফুল’ ও ‘দুল’, ‘বালিকা’ ও ‘মালিকা’, ‘গায়’ ও ‘পায়’,এ ধরনের ধ্বনিগত সাদৃশ্য গানের পঙক্তিগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

 

বিশেষ করে ‘ফুল–দুল’, ‘বালিকা–মালিকা’, ‘গায়–পায়’ ধরনের মিল শ্রোতার কানে একটি স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তনের অনুভূতি তৈরি করে।

 

গীতিকবিতায় অন্ত্যমিল কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি স্মরণযোগ্যতাও বাড়ায়। ফলে গানটি সহজে মনে থাকে এবং গাওয়ার সময় পঙক্তির মধ্যে একটি সুরেলা সম্পর্ক বজায় থাকে।

 

ছন্দ ও লয়ের দিক

গানটির ছন্দ বিশ্লেষণ করতে হলে এটিকে নিছক লিখিত কবিতা হিসেবে দেখলে চলবে না। কারণ গানের ছন্দ অনেকাংশে নির্ভর করে উচ্চারণ, সুর, মাত্রা, বিরতি ও গায়কির ওপর।

 

এই গানটি দাদরা তালে পরিবেশিত হয় বলে তার গীতিময় গতি একটি কোমল, দোলায়িত আবহ তৈরি করতে সহায়তা করে। নির্ভরযোগ্য নজরুলগীতি-সংগ্রহে গানটির তাল দাদরা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

 

দাদরা ছয় মাত্রার তাল। হিন্দুস্তানি ও উপমহাদেশীয় লঘু সংগীতধারায় এর ব্যবহার ব্যাপক। প্রেম, কোমলতা, লাবণ্য ও আবেগপ্রবণ গীতধর্মী রচনার সঙ্গে এই তালের একটি স্বাভাবিক সামঞ্জস্য রয়েছে।

 

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন: কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবেশনায় গায়ক বা সংগীতপরিচালক সামান্য ভিন্ন লয়, অলংকার বা সুরপ্রয়োগ করতে পারেন। তাই গানটির মূল সংগীতরূপ এবং পরবর্তী পরিবেশনার রূপকে এক করে দেখা উচিত নয়।

 

রাগ প্রসঙ্গে সতর্কতা

 

গানটির রাগ সম্পর্কে বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক উৎসে বিভিন্ন মত পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রামাণ্য অনলাইন নজরুলগীতি-সংগ্রহে এই গানের রাগের ঘরটি নির্দিষ্টভাবে পূরণ করা নেই; সেখানে তাল হিসেবে দাদরা উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অতএব গানটির রাগ হিসেবে পিলু, খাম্বাজ বা অন্য কোনো রাগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা যথাযথ হবে না, যদি না নির্ভরযোগ্য স্বরলিপি বা প্রামাণ্য সংগীততাত্ত্বিক উৎস দিয়ে তা সমর্থন করা যায়।

 

এখানে একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় আছে। সাহিত্য বা সংগীত নিয়ে লিখতে গিয়ে অনেক সময় জনপ্রিয় ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য যাচাই না করে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু গবেষণামূলক বা তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় যে তথ্য নিশ্চিত, সেটিকে নিশ্চিতভাবে এবং যে তথ্য বিতর্কিত বা অনির্দিষ্ট, সেটিকে সতর্ক ভাষায় উপস্থাপন করা উচিত।

 

এই গানটির ক্ষেত্রেও সেই নীতিই অনুসরণ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

নজরুলের প্রেমভাবনা ও এই গান

নজরুলের প্রেমের গানকে তাঁর বিদ্রোহী সত্তার বিপরীত হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

বরং তাঁর প্রেম ও বিদ্রোহ একই মানবিক সত্তার দুটি প্রকাশ।

যে কবি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে মুক্ত করতে চেয়েছেন, তিনিই প্রেমের মধ্যেও মানুষের মুক্তি, সৌন্দর্য ও আবেগের প্রকাশ খুঁজেছেন।

 

নজরুলের প্রেমে কখনো আছে তীব্র আকুলতা, কখনো বিরহ, কখনো কামনা, কখনো আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ, আবার কখনো আছে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।

 

‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ সেই প্রেমভাবনার কোমল ও স্বপ্নময় দিককে সামনে আনে।

 

এখানে কোনো বিরহের দীর্ঘ বিলাপ নেই। নেই প্রেমের ব্যর্থতার করুণ আর্তি। বরং আছে পাওয়ার আনন্দ, সাজানোর আনন্দ, কল্পনা করার আনন্দ এবং প্রিয় মানুষটিকে সৌন্দর্যের সর্বোচ্চ আসনে বসানোর আনন্দ।

 

এই কারণে গানটির আবেগ মূলত আনন্দময় রোমান্টিকতা দিয়ে নির্মিত।

 

নারী ও সৌন্দর্যের কল্পনা

 

গানটিতে নারীকে সাজানোর যে প্রবল আগ্রহ দেখা যায়, তা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যচর্চা নয়। কবি আসলে নিজের সৌন্দর্যবোধের মাধ্যমে প্রেয়সীকে পুনর্নির্মাণ করছেন।

 

প্রেয়সীর চুল প্রকৃতির মেঘের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তাঁর অলংকার আকাশের চাঁদ ও তারায় তৈরি হচ্ছে, তাঁর শরীর জোছনা ও চন্দনের সৌন্দর্যে আবৃত হচ্ছে, তাঁর পায়ের আলতা রামধনুর রঙে রঞ্জিত হচ্ছে।

 

অর্থাৎ, নারী ও প্রকৃতি এখানে পৃথক দুটি সত্তা নয়।

 

প্রকৃতির সৌন্দর্য নারীসৌন্দর্যে রূপান্তরিত হয়েছে এবং নারীসৌন্দর্য আবার প্রকৃতিকে নতুন অর্থ দিয়েছে।

 

নজরুলসংগীতে চিত্রকল্পের ব্যবহার নিয়ে আলোচনাতেও এই গানটির ক্ষেত্রে নারীসৌন্দর্য ও প্রকৃতিসৌন্দর্যের মিলনকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

গানটির সংগীতায়ন ও পরিবেশনার ঐতিহ্য

 

গানটির জনপ্রিয়তা শুধু এর বাণীর কারণে নয়। বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে এর পরিবেশনা গানটিকে নতুন নতুন শ্রুতিরূপ দিয়েছে।

 

নজরুলগীতি-সংগ্রহে এই গানের একাধিক শিল্পীর অডিও পরিবেশনার উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে মানবেন্দ্র, ধীরেন বসু এবং জাহিদ আনোয়ার ও রহমানের নাম পাওয়া যায়।

 

আধুনিক সময়েও গানটি বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে পরিবেশিত হচ্ছে। এর ফলে গানটির মূল কাব্যিক আবেগ অক্ষুণ্ণ রেখেও গায়কির ভিন্নতা তৈরি হচ্ছে।

 

এখানেই একটি পুরোনো গানের নতুন হয়ে ওঠার ক্ষমতা নিহিত।

 

একটি ভালো গান কেবল তার রচনাকালের সঙ্গে বেঁচে থাকে না; পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পী ও শ্রোতারা যখন নিজেদের অনুভূতি দিয়ে তাকে নতুনভাবে গ্রহণ করেন, তখন সেটি নতুন জীবন পায়।

 

নজরুলের সৃষ্টিসম্ভারে গানটির অবস্থান

 

কাজী নজরুল ইসলামের সংগীতসৃষ্টির পরিমাণ ও বৈচিত্র্য এত ব্যাপক যে তাঁর একটি গানকে বিচার করতে হলে সামগ্রিক নজরুলসংগীতের প্রেক্ষাপটও মনে রাখতে হয়।

 

নজরুলের গান ধর্মীয়, দেশাত্মবোধক, শ্যামাসংগীত, ইসলামী গান, গজল, প্রেমের গান, প্রকৃতির গান এবং নানা সামাজিক ও মানবিক অনুভূতিকে ধারণ করেছে।

 

এই বৈচিত্র্যের মধ্যেও ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ বিশেষভাবে স্মরণীয় তার চিত্রকল্পনির্ভর রোমান্টিকতার জন্য।

 

এ গান শুনলে প্রথমেই মনে পড়ে না কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক প্রতিবাদ বা দার্শনিক তর্ক। মনে পড়ে এক প্রেমিকের কল্পনা,যে তার প্রেয়সীকে সাজাতে গিয়ে পুরো বিশ্বপ্রকৃতিকেই নিজের অলংকারের বাক্সে পরিণত করেছে।

 

এই স্বাতন্ত্র্যই গানটিকে আলাদা করে।

 

আধুনিক যুগে গানটির প্রাসঙ্গিকতা

 

প্রযুক্তির যুগে মানুষের জীবনযাপন বদলেছে, প্রেমের প্রকাশের মাধ্যম বদলেছে, যোগাযোগের ধরন বদলেছে। কিন্তু প্রিয় মানুষকে বিশেষ করে তোলার আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি।

 

আজকের মানুষ হয়তো তারার ফুল সত্যিই খোঁপায় দিতে পারে না, কিন্তু প্রিয়জনকে আকাশের তারার সঙ্গে তুলনা করে। চাঁদের আলোকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে। ফুল, বৃষ্টি, চাঁদ, আকাশ, রংধনু,এসব আজও প্রেমের ভাষার অংশ।

 

এই অর্থে গানটির আবেগ এখনো সমকালীন।

 

গানটির জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ হলো এর সর্বজনীন কল্পনা। এখানে প্রেমের ভাষা জটিল নয়। প্রেমিক তার প্রেয়সীকে সুন্দর করে তুলতে চান, তাঁকে বিশেষ মর্যাদা দিতে চান এবং নিজের শিল্পসত্তাকে তাঁর কাছে নিবেদন করতে চান।

এই অনুভূতি সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না।

গবেষণার দৃষ্টিতে গানটির গুরুত্ব

গানটিকে শুধু জনপ্রিয় প্রেমের গান হিসেবে দেখলে এর সাহিত্যিক গুরুত্বের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে।

এটি বাংলা গীতিকবিতায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একসঙ্গে পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়,

 

প্রথমত, প্রকৃতি ও মানবপ্রেমের সম্পর্ক।

দ্বিতীয়ত, নারীসৌন্দর্যের কাব্যিক নির্মাণ।

তৃতীয়ত, রূপক ও চিত্রকল্পের ব্যবহার।

চতুর্থত, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার সমন্বয়।

পঞ্চমত, গীতিকবিতায় শব্দ ও সুরের পারস্পরিক সম্পর্ক।

ষষ্ঠত, নজরুলের প্রেমভাবনার রোমান্টিক ও কল্পনাময় দিক।

সপ্তমত, প্রকৃতির উপাদানকে মানবিক আবেগের প্রতীকে রূপান্তর করার কৌশল।

অষ্টমত, গানের শেষাংশে শিল্পসত্তার আত্মনিবেদন।

 

এই সবগুলো স্তর একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, গানটি কেবল একটি প্রেমের গান নয়; এটি নজরুলের নন্দনতত্ত্ব বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।

 

গানটির অন্তর্নিহিত দর্শন: ভালোবাসা মানেই সৃষ্টি

গানটির সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই।

 

প্রেমিক এখানে শুধু কিছু পেতে চান না; তিনি কিছু সৃষ্টি করতে চান।

 

তিনি প্রেয়সীর জন্য অলংকার কল্পনা করেন, সৌন্দর্যের দৃশ্য নির্মাণ করেন, প্রকৃতিকে নতুনভাবে সাজান এবং শেষে নিজের সাত সুর ও কবিতাকে তাঁর কাছে উৎসর্গ করেন।

 

অর্থাৎ, প্রেম এখানে ভোগের বিষয় নয়; প্রেম সৃষ্টির প্রেরণা।

 

এ কারণেই গানের শেষাংশটি প্রথমাংশের চেয়ে গভীর।

শুরুতে কবি প্রকৃতি থেকে উপাদান সংগ্রহ করছেন। শেষে এসে তিনি নিজের সৃষ্টিশীল সত্তাকেই উপহার দিচ্ছেন।

এখানে প্রেম এবং শিল্প এক হয়ে যায়।

প্রকৃতির ফুল একদিন ঝরে যাবে। চাঁদের আলো বদলে যাবে। রামধনু মিলিয়ে যাবে। মেঘ সরে যাবে। কিন্তু গান ও কবিতা মানুষের স্মৃতিতে টিকে থাকতে পারে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘কবিতার বুলবুল’ শুধু একটি পাখির চিত্রকল্প নয়; এটি কবির শিল্পসত্তারও এক সুন্দর প্রতীক।

 

কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ বাংলা গীতিকবিতায় প্রেম, প্রকৃতি ও কল্পনার এক অপূর্ব সম্মিলন। এখানে প্রেমিক তাঁর প্রেয়সীকে সাজাতে গিয়ে পৃথিবীর প্রচলিত অলংকারের সীমা অতিক্রম করেছেন। তাঁর কাছে তারাই ফুল, চাঁদই দুল, হংসসারিই মালা, মেঘই চুল, বিদ্যুৎই ফিতা, জোছনাই প্রসাধন এবং রামধনুই আলতার রং।

 

কিন্তু গানটির সৌন্দর্য শুধু এই বিচিত্র উপমা ও রূপকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে কল্পনার স্বাধীনতায়।

 

নজরুল বাস্তব পৃথিবীর সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করেননি। প্রেমের জগতে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। আকাশ থেকে তারা নামিয়েছেন, চাঁদকে অলংকার করেছেন, মেঘকে চুলে রূপ দিয়েছেন, রামধনু থেকে রং ছেঁকে এনেছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের গানের সাত সুর দিয়ে নির্মাণ করেছেন প্রেমের বাসর।

 

এই নির্মাণের মধ্যেই কবির সবচেয়ে বড় আত্মনিবেদন।

 

কারণ শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো বস্তুগত সম্পদ দিয়ে প্রেয়সীকে জয় করতে চান না; তিনি তাঁকে দিতে চান নিজের গান, নিজের কবিতা, নিজের কল্পনা এবং নিজের শিল্পসত্তা।

 

এই কারণেই ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ কেবল একটি রোমান্টিক গান নয়। এটি প্রেমের সৌন্দর্যবোধ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, কল্পনার স্বাধীনতা এবং শিল্পের আত্মনিবেদনের এক অপূর্ব গীতিকাব্য।

 

নজরুলের হাতে প্রেম কখনো শুধু ব্যক্তিগত আবেগ হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক অন্তরঙ্গ সংলাপ।

 

আর সেই সংলাপের ভাষা কখনো তারার ফুল, কখনো চৈতী চাঁদের দুল, কখনো মেঘরঙা চুল, কখনো রামধনুর লাল, আবার কখনো কবিতার বুলবুল।

 

বাংলা গানের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কল্পনাময় প্রেমের ভাষা খুব বেশি নেই। তাই সময় যতই বদলাক, মানুষের প্রেমের প্রকাশ যতই নতুন নতুন মাধ্যমে ঘটুক, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ তার স্বপ্নময় সৌন্দর্য নিয়ে শ্রোতার হৃদয়ে ফিরে আসতেই থাকবে।

 

এ গান আমাদের মনে করিয়ে দেয়,ভালোবাসা যখন সত্যিই গভীর হয়, তখন পৃথিবীর পরিচিত জিনিসগুলোও নতুন হয়ে ওঠে। তারা শুধু তারা থাকে না, ফুল হয়ে যায়; চাঁদ শুধু চাঁদ থাকে না, দুল হয়ে যায়; আর মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত কয়েকটি সুরও হয়ে উঠতে পারে একটি সম্পূর্ণ ভালোবাসার পৃথিবী।

 

তথ্যসূত্র ও প্রাসঙ্গিক উৎস

 

১. নজরুলগীতি.অর্গ , গানটির বাণী, দাদরা তাল, অডিও, ভিডিও ও স্বরলিপি-সংক্রান্ত তথ্য।

২. নজরুল সঙ্গীতকোষ , ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ গানটির বাণী ও নজরুলগীতি-সংগ্রহে অবস্থান।

৩. কবি নজরুল ইনস্টিটিউট , ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ গানটির স্বরলিপি ও সংগীত-সংগ্রহে অন্তর্ভুক্তির তথ্য।

৪. বাংলাদেশ প্রতিদিন , নজরুলসংগীতে চিত্রকল্পের ব্যবহার প্রসঙ্গে গানটির উল্লেখ ও বিশ্লেষণ।

 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ঝরোকা পরিবারে আপনাকে স্বাগতম! অনুগ্রহ করে গঠনমূলক ও মার্জিত মন্তব্য করুন।;

comment url