শিক্ষার্থীদের কথা বলার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে না পারার কারণেই শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের মনে অশ্রদ্ধার জন্ম দিয়েছে।

 

ACEM Training Course - Assignment

৪৮তম এসিইএম ট্রেনিং কোর্স (ACEM Training Course)

মডিউল: ০১ | অ্যাসাইনমেন্ট

গ্রুপ নম্বর: ০৩

অ্যাসাইনমেন্টের শিরোনাম: শিক্ষার্থীদের কথা বলার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে না পারার কারণেই শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের মনে অশ্রদ্ধার জন্ম দিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের কথা বলার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে না পারার কারণেই শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের মনে অশ্রদ্ধার জন্ম দিয়েছে

১. ভূমিকা

শিক্ষাদান কেবল একমুখী জ্ঞান বিতরণের কোনো যান্ত্রিক বা কেবল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি দ্বি-পাক্ষিক সংবেদনশীল, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের কথা বলার স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তার চর্চা এবং নিজস্ব মতামত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যক্ত করার ভীতিহীন পরিবেশকে শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক শ্রেণীকক্ষ কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান হস্তান্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা শিক্ষার্থীকে নিষ্ক্রিয় শ্রোতার অবস্থান থেকে রূপান্তর করে একজন সক্রিয় অংশীদারে।

তবে আমাদের প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা তাদের মনের স্বাভাবিক দ্বিধা, সুপ্ত প্রশ্ন, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা সৃজনশীল চিন্তাভাবনা প্রকাশের জন্য উপযুক্ত এবং ভীতিহীন পরিবেশ পায় না। যখন শ্রেণীকক্ষে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা এবং উন্মুক্ত সংলাপের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসে, তখন শিক্ষার্থী নিজেকে একজন নিষ্প্রভ, গুরুত্বহীন এবং পরোক্ষ সত্তা হিসেবে মনে করতে শুরু করে। এই অবদমিত মানসিক পরিস্থিতি কেবল তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ও চিন্তাচেতনাকেই বাধাগ্রস্ত করে না, বরং শিক্ষকের প্রতি তাদের হৃদয়ে যে স্বাভাবিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মানের স্থান থাকার কথা ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে তৈরি হয় মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব, সুপ্ত ক্ষোভ এবং প্রাতিষ্ঠানিক অশ্রদ্ধা। এই অ্যাসাইনমেন্টের মূল উদ্দেশ্য হলো—শিক্ষার্থীদের কথা বলার পরিবেশের অভাব কীভাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার আত্মিক ও পেশাগত সম্পর্কে ফাটল ধরায় এবং এর মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি ও বাস্তবসম্মত সমাধান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা।

২. বিষয়বস্তুর বিস্তারিত বিশ্লেষণ

শ্রেণীকক্ষে যোগাযোগের মুক্ত ও উন্মুক্ত আবহ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মানবিক ও পেশাগত গভীরতা একে অপরের পরিপূরক। যখন একজন শিক্ষার্থী তার চিন্তা বা অনুভূতির কথা নির্ভয়ে প্রকাশ করার মানসিক স্থান (Mental Space) পায় না, তখন তা কেবল তার শিখন সক্ষমতাকেই ধীর করে না, বরং তার সামগ্রিক মনস্তাত্ত্বে এক ধরণের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নিচে এই মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মাত্রাসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

২.১ একমুখী শিক্ষাদান ও কর্তৃত্ববাদী পরিবেশের প্রভাব

আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো শ্রেণীকক্ষে 'অথরিটেরিয়ান' বা একমুখী কর্তৃত্ববাদী শিক্ষাদান পদ্ধতির ধারাবাহিক উপস্থিতি। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক কেবল তথ্য প্রদান করেন এবং শিক্ষার্থীকে তা প্রশ্নহীনভাবে মুখস্থ করার প্রত্যাশা করা হয়। এই কাঠামোতে শিক্ষার্থীকে কেবল নিষ্ক্রিয় গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শ্রেণীকক্ষে যদি প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা না থাকে, কিংবা কোনো শিক্ষার্থী তার নিজস্ব উপায়ে বিষয়টি বোঝার জন্য প্রশ্ন করলে তাকে শিক্ষক কর্তৃক নিরউৎসাহিত করা হয় বা ধমক দেওয়া হয়, তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে এক অদৃশ্য ও সুদৃঢ় প্রাচীর তৈরি হয়। এর ফলে শ্রেণীকক্ষ শিক্ষার আনন্দময় কেন্দ্র না হয়ে কেবল নীরব আনুগত্য প্রদর্শনের স্থানে পরিণত হয়।

২.২ মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা, ভীতি ও ক্ষোভের উন্মেষ

শিক্ষার্থীরা যখন দেখে যে তাদের যুক্তি, কৌতূহল বা অভিমতকে শ্রেণীকক্ষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, কিংবা ভুল উত্তর দেওয়ার জন্য তাদের সহপাঠীদের সামনে অপমানিত বা হাস্যাস্পদ করা হচ্ছে, তখন তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও হীনমন্যতা শিক্ষার্থীকে ক্রমাগত নীরব করে তোলে। ভুল করার এই ভয় এবং আত্মসম্মান রক্ষার তাগিদ থেকে শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেয়। এই অবদমিত অনুভূতি কালক্রমে শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার প্রতি এক ধরণের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ, বিদ্বেষ এবং অশ্রদ্ধায় রূপ নেয়, যা তাদের আচরণের মাধ্যমে ফুটে ওঠে।

২.৩ শ্রদ্ধা বনাম ভয়ের ভুল সমীকরণ

প্রথাগত ধারণায় ভীতি প্রদর্শন, কঠোর শাসন এবং শারীরিক বা মানসিক চাপ সৃষ্টিকে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান হাতিয়ার মনে করা হতো। কিন্তু আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিশু মনস্তত্ত্ব প্রমাণ করেছে যে—ভয় এবং শ্রদ্ধার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। ভীতি থেকে যে অনুগত আচরণ পাওয়া যায়, তা সাময়িক, কৃত্রিম এবং বাহ্যিক। ভয় কেটে গেলেই বা শিক্ষকের অগোচরে সেই অনুগত আচরণ বিলুপ্ত হয়। পক্ষান্তরে, প্রকৃত শ্রদ্ধার জন্ম হয় পারস্পরিক মেলবন্ধন, সহানুভূতি, আস্থা এবং মুক্ত মতামত প্রকাশের ভীতিহীন নিরাপত্তা থেকে। যখন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে একচ্ছত্র ভয়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সাময়িকভাবে নিস্তব্ধতা মিললেও অন্তরালে জন্ম নেয় গভীর অশ্রদ্ধা।

৩. পক্ষে মতামত (কথা বলার পরিবেশের অভাবই অশ্রদ্ধার কারণ)

শ্রেণীকক্ষে মত প্রকাশের সুযোগ না থাকা যে সরাসরি শিক্ষকের প্রতি অশ্রদ্ধা ও দূরত্বের জন্ম দেয়, তার পক্ষে যুক্তিগুলো নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:

৩.১ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ঘাটতি ও একাকীত্ব

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পাঠ্যবই পড়ার স্থান নয়, এটি ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ার ও সামাজিকীকরণের মূল কেন্দ্র। শ্রেণীকক্ষে কথা বলার এবং মুক্ত আলোচনার সুযোগ না পেলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতামতহীন ও নিষ্প্রভ মনে করে। শিক্ষকের এই একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও একচ্ছত্র কর্তৃত্বের কারণে শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষকে নিজেদের ক্ষেত্র হিসেবে ভাবতে পারে না। এই ক্ষমতাহীনতার অনুভূতি শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষার্থীদের মনে নেতিবাচক মনোভাব ও অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।

৩.২ অবদমিত সংশয় ও প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থা

শিক্ষার্থী যখন কোনো জটিল পাঠ্যবিষয় বা শিক্ষকের কোনো নির্দেশনায় অস্পষ্টতা অনুভব করে, কিন্তু প্রশ্ন করার ভয়হীন সুযোগ না পায়, তখন তাদের মনে তৈরি হয় সংশয়। প্রশ্ন বা দ্বিধা নিরসনের পথ বন্ধ থাকলে পাঠ্যবিষয় ও শিক্ষকের নির্দেশনা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই অবদমিত সংশয় থেকেই তৈরি হয় শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা ও আন্তরিকতার প্রতি গভীর অনাস্থা, যা পরবর্তীতে শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দেয়।

৩.৩ মানবিক যোগাযোগের অভাব ও দূরত্বের জন্ম

যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন না, তাদের আবেগ ও চিন্তাকে গুরুত্ব দেন না, তাকে শিক্ষার্থীরা হৃদয়ের কাছাকাছি স্থান দিতে পারে না। এর ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মধ্যে মানবিক স্পর্শ হারিয়ে যায়। শিক্ষক কেবল একজন বেতনভোগী কর্মকর্তা বা নির্দেশক হিসেবে পরিগণিত হন। মানবিক সম্পর্কের এই অনুপস্থিতি শিক্ষকের প্রতি স্বাভাবিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাকে বিনষ্ট করে।

৪. বিপক্ষে মতামত (केवल পরিবেশের অভাবই অশ্রদ্ধার একমাত্র কারণ নয়)

উন্মুক্ত কথা বলার পরিবেশের অভাব শিক্ষকের প্রতি অশ্রদ্ধা তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ হলেও, এটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা শিক্ষাবিজ্ঞানসম্মত নয়। শিক্ষার্থীদের মনে অশ্রদ্ধা ও দূরত্ব তৈরির পেছনে আরও বেশ কিছু সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে:

৪.১ শিক্ষকের নীতি-নৈতিকতা, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার ঘাটতি

একজন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে কতটা মুক্ত পরিবেশ দিচ্ছেন তার চেয়েও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার নিজস্ব চরিত্র, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত মান। শিক্ষক যদি পক্ষপাতিত্ব করেন, সময়ানুবর্তিতা না মানেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করেন কিংবা বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে দুর্বল হন, তবে শ্রেণীকক্ষে কথা বলার যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা তাকে মন থেকে শ্রদ্ধা করতে পারে না। শিক্ষকের নৈতিক স্খলন ও পেশাগত যোগ্যতার অভাব অশ্রদ্ধার একটি বড় কারণ।

৪.২ পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের সার্বিক অবক্ষয়

বর্তমান যুগে পরিবার ও সামাজিক স্তরে মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় লক্ষ্য করা যায়। অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির ব্যবহার, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এবং পারিবারিক শিক্ষার অভাবের কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মানসিকতা গড়ে ওঠে না। পারিবারিক পর্যায় থেকে যদি গুরুজনদের সম্মান জানানোর পাঠ না দেওয়া হয়, তবে শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ চমৎকার থাকলেও শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের প্রতি ঔদ্ধত্য বা অসংবেদনশীল আচরণ প্রদর্শন করতে পারে।

৪.৩ শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সীমানা ও সীমাবদ্ধতা

আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অত্যধিক। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ধারণক্ষমতা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশাল সিলেবাস শেষ করার তীব্র চাপ এবং পরীক্ষা-কেন্দ্রিক জিপিএ-নির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে শিক্ষকরা অনেক সময় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কথা বলার বা তাদের মতামত শোনার পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট দূরত্বকে কেবল শিক্ষকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা সদিচ্ছার অভাব হিসেবে দেখা অন্যায্য।

৫. নম্বর বণ্টন ও মূল্যায়নের মানদণ্ড অনুযায়ী বিশ্লেষণ

বিবেচ্য বিষয়/অধ্যায় বিবরণ ও কৌশল নির্ধারিত নম্বর
ভূমিকা বিষয়বস্তুর প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব এবং মূল উদ্দেশ্য উপস্থাপন।
বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণ একমুখী শিক্ষাদান, মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব এবং ভয় বনাম শ্রদ্ধার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
পক্ষে মতামত কথা বলার পরিবেশ না থাকার কারণে কীভাবে অশ্রদ্ধা তৈরি হয় তার পক্ষে যুক্তিসমূহ।
বিপক্ষে মতামত অশ্রদ্ধার পেছনে অন্যান্য কারণ যেমন নৈতিকতা, সমাজ ও কাঠামোগত দুর্বলতা।
উপসংহার সমস্যা উত্তরণের উপায় এবং শিক্ষকের সুহৃদ ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরা।
তথ্যসূত্র যথাযথ একাডেমিক উৎস ও রেফারেন্সের সঠিক ব্যবহার।
লেখা ও উপস্থাপন কৌশল ভাষার সাবলীলতা, কাঠামোগত বিন্যাস ও বানান শুদ্ধতা।
মোট নম্বর সম্পূর্ণ অ্যাসাইনমেন্টের মোট মূল্যায়ন ২০

৬. সমস্যা উত্তরণে সুপারিশ ও শিক্ষকের পরিবর্তিত ভূমিকা

  • সুহৃদ পরামর্শদাতা (Facilitator) হিসেবে শিক্ষকের আত্মপ্রকাশ: শিক্ষককে কেবল জ্ঞান বিতরণকারী বা নিয়ন্ত্রক না হয়ে একজন পথপ্রদর্শক ও সহমর্মী শিক্ষক হতে হবে।
  • প্রশ্ন করাকে উৎসাহিত করা: শ্রেণীকক্ষে যেকোনো ভুল বা অদ্ভুত প্রশ্নকেও ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী নিজেকে লজ্জিত মনে না করে।
  • সহযোগিতামূলক শিখন (Interactive Learning): দলগত কাজ, বিতর্ক ও উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কথা বলার সুনির্দিষ্ট সময় ও সুযোগ তৈরি করতে হবে।
  • পেশাগত প্রশিক্ষণ ও আচরণগত উন্নয়ন: শিক্ষকদের নিয়মিত শিশু মনস্তত্ত্ব, শিক্ষাবিজ্ঞান এবং ইতিবাচক যোগাযোগ কৌশলের ওপর আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

৭. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধাবোধ কোনো নিয়ম তৈরি করে বা প্রাতিষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগ করে জোরপূর্বক আদায় করার বিষয় নয়; এটি শিক্ষককে তার আচরণ, ভালোবাসা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে অর্জন করে নিতে হয়। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের কথা বলার, প্রশ্ন তোলার, সংশয় নিরসনের এবং স্বাধীন মত প্রকাশের ভীতিহীন পরিবেশ তৈরি করতে না পারা নিঃসন্দেহে তাদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও অশ্রদ্ধার জন্ম দেয়। তবে একই সাথে শিক্ষকের ব্যক্তিগত নৈতিকতা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক যখন কেবল নির্দেশক না হয়ে একজন সহমর্মী পরামর্শদাতা (Facilitator) হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন এবং শিক্ষার্থীর মুক্ত চিন্তাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাগত জানাবেন, তখনই শ্রেণীকক্ষে একটি প্রাণবন্ত ও স্বস্থিপ্রদ পরিবেশ গড়ে উঠবে এবং শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের অন্তরের গভীর থেকে শ্রদ্ধাবোধ পুনরুজ্জীবিত হবে।

৮. তথ্যসূত্র (References)

  1. খান, ড. এম. এ. এইচ. (২০১৯)। শিক্ষাতত্ত্ব, শিক্ষানীতি ও আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি। ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।
  2. চৌধুরী, ড. সুলতানা ও রহমান, এম. (২০২১)। শিক্ষাবিজ্ঞান ও শ্রেণীকক্ষ ব্যবস্থাপনা। ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা।
  3. ইসলাম, ড. রফিকুল (২০২০)। শিক্ষা মনস্তত্ত্ব ও শিশুর বিকাশ। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
  4. হুসেইন, এ. টি. এম. ও আহমেদ, এস. (২০১৮)। শ্রেণীকক্ষে শিখন-শেখানো কৌশল ও শিক্ষকের ভূমিকা। ঢাকা: ন্যাশনাল পাবলিকেশন্স।
  5. ফ্রেইরে, পাওলো (২০১০)। শোষিতের শিক্ষাতত্ত্ব (Pedagogy of the Oppressed) (বঙ্গানুবাদ: মানস চৌধুরী)। ঢাকা: মুক্তধারা প্রকাশনী।
  6. জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) (২০২২)। শিক্ষক সংস্করণ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষন কৌশল নির্দেশিকা। ঢাকা: এনসিটিবি প্রকাশনা।
  7. বিশ্বাস, প্রদীপ কুমার (২০১৭)। উচ্চতর শিক্ষাবিজ্ঞান ও শ্রেণীকক্ষ পরিচালনা। ঢাকা: জ্ঞানকোষ প্রকাশনী।
  8. করিম, প্রফেসর ড. মো. রেজাউল (২০২১)। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, পরিদর্শন ও মনিটরিং। ঢাকা: বুক ক্লাব পাবলিশার্স।
  9. রশীদ, ড. এ. (২০২০)। শিক্ষায় যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ। ঢাকা: অনন্যা প্রকাশনী।
  10. শেখ, ড. মো. জহিরুল ইসলাম (২০১৯)। শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষাদান ও কার্যকর শ্রেণী পরিবেশ। ঢাকা: আদর্শ প্রকাশনী।
  11. বেগম, ড. শাহানাজ (২০১৮)। বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান ও শ্রেণীকক্ষ মিথস্ক্রিয়া। ঢাকা: শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IER), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
  12. সেন, অরূপ ও দয়াল, সুনীল (২০১৭)। শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষণে মানবিক মূল্যবোধ। কলকাতা: রীতা পাবলিকেশন।
  13. জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (NAEM) (২০২৩)। এসিইএম প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েল ও মডিউল সংকলন। ঢাকা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
  14. ভ্যাটিমো, জিয়ান্নি (২০১৬)। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান ও মুক্তচিন্তা (অনুবাদ: ড. হারুন-অর-রশীদ)। ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
  15. আলী, এস. এম. ও হোসেন, এম. ডি. (২০২২)। "বাংলাদেশি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক," শিক্ষা ও গবেষণা সাময়িকী, খণ্ড ১৮, ইস্যু ১, পৃষ্ঠা ৪৫-৬২।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ঝরোকা পরিবারে আপনাকে স্বাগতম! অনুগ্রহ করে গঠনমূলক ও মার্জিত মন্তব্য করুন।;

comment url