হুদায়বিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়

 

হুদায়বিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়: মহানবী (সা.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ঐতিহাসিক সাফল্য

তেইশ বছরের নবুয়তি জীবনে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অসংখ্য বড় বড় সংকট ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। জীবনের প্রতিটি স্তরে তিনি অসাধারণ প্রজ্ঞা, ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। মক্কি জীবনের তেরোটি বছর কেটেছে নানা ভয়-ভীতি, নির্যাতন, হতাশা ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। 


এই সময়ের প্রথম দিকে চাচা আবু তালিব এবং স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.)-এর আন্তরিকতা ও মধুর সান্ত্বনায় তিনি মাঝে মাঝে আশ্রয় খুঁজে পেলেও তাঁদের মৃত্যুর পর মহানবী (সা.)-এর জন্য আর কোনো পার্থিব আশ্রয় অবশিষ্ট ছিল না।

এদিকে কুরাইশদের অত্যাচার ও নির্যাতন যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন মহান আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। মহানবী (সা.)-এর জীবনে হিজরত একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। জীবনের এক কঠিন অভিজ্ঞতার কারণে মাতৃভূমি মক্কা ছেড়ে তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল। অথচ পরবর্তী মাত্র আট বছরের মধ্যে সেই মক্কাই বিজয় করেন তিনি এবং এক মহান বিপ্লবী নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে মহানবী (সা.)-এর মক্কা বিজয় নিঃসন্দেহে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়েই মূলত সমগ্র আরব তথা বিশ্বে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের পথ সুগম হয়। হিজরত থেকে মক্কা বিজয় পর্যন্ত আট বছরের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং সন্ধি রচনার প্রেক্ষাপট বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী (সা.)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফলে ইসলাম যেভাবে দ্রুত প্রসার লাভ করেছিল, এর আগে আর কোনো ঘটনার মাধ্যমে তা এতটা সম্ভব হয়নি।

পবিত্র কুরআনে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে ‘ফাতহুম মুবিন’ বা সুস্পষ্ট বিজয় হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। হযরত আবু বকর (রা.)-ও এ সন্ধির গুরুত্ব বোঝাতে বলেছিলেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে মুসলমানরা যে বিজয় অর্জন করেছিলেন, তার অনুরূপ বিজয় আর কখনো হয়নি। সুতরাং একথা অযৌক্তিক হবে না যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহই মূলত মক্কা বিজয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল।

হিজরত ও মদিনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা

নবুয়তের ত্রয়োদশ বছরে মহানবী (সা.) মাতৃভূমি মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গমন করেন। মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। এ সময় তিনি বারবার মক্কার দিকে ফিরে তাকাচ্ছিলেন। এতে মাতৃভূমি মক্কার প্রতি তাঁর গভীর আবেগ ও ভালোবাসার প্রমাণ পাওয়া যায়।

মনে হয়, মাতৃভূমি মক্কায় ফিরে আসার একটি দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা মহানবী (সা.)-এর হৃদয়ে সবসময় জাগ্রত ছিল। ফলে মদিনার নতুন পরিবেশে বসবাস এবং ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করলেও মক্কার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও আকর্ষণ কখনো কমেনি।

অন্যদিকে, মক্কার কুরাইশরা মহানবী (সা.)-কে নির্যাতন করে মক্কা থেকে হিজরত করতে বাধ্য করেই ক্ষান্ত হয়নি। ইসলাম যেন আর প্রসারিত হতে না পারে এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রভাব যেন আর বৃদ্ধি না পায়, সে উদ্দেশ্যে তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় হিজরিতে বদরের যুদ্ধ, তৃতীয় হিজরিতে উহুদের যুদ্ধ, পঞ্চম হিজরিতে খন্দকের যুদ্ধসহ বিভিন্ন সময়ে নানা সংঘাত ও সামরিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

মূলত এসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধ-বিগ্রহই হুদায়বিয়ার সন্ধির পটভূমি তৈরি করে এবং পরিশেষে মক্কা বিজয়ের পথ সুগম করে।

মদিনা সনদ: ঐক্যবদ্ধ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি

মহানবী (সা.) হিজরত করে মদিনায় পৌঁছে রাষ্ট্রনায়কোচিত যে কাজটি সর্বপ্রথম সম্পন্ন করেছিলেন, তা হলো মদিনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী সকল গোত্র ও নাগরিককে নিয়ে একটি সনদ প্রণয়ন। ইতিহাসে এটি ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত।

মদিনায় তিন শ্রেণির মানুষ বসবাস করত। তারা হলো মুসলমান, ইহুদি ও পৌত্তলিক। মদিনার মুসলমানরা প্রধানত দুটি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল—আওস ও খাজরাজ। তারাও বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত ছিল। ইহুদিরা প্রধানত তিনটি দলে বিভক্ত ছিল—বনু নাজির, বনু কুরায়জা ও বনু কায়নুকা। এসব গোত্র ও উপগোত্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতির সম্পর্ক সবসময় ছিল না।

মদিনার অনেক পৌত্তলিক ইসলাম গ্রহণ করলেও সুযোগ পেলেই মহানবী (সা.)-এর বিরোধিতা করার জন্য কিছু লোক সক্রিয় ছিল। ফলে মদিনার বিভিন্ন গোত্র, দল ও উপদলকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে মহানবী (সা.) সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও সংহতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন। সনদের শর্তগুলো ছিল মহানবী (সা.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক।

এই সনদের মাধ্যমে মহানবী (সা.) মূলত মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন এবং সমগ্র মদিনাবাসী তাঁর নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক জাতিসত্তা হিসেবে সংগঠিত হয়। মদিনার কল্যাণ ও উন্নয়নে সকল সম্প্রদায়ের আত্মনিয়োগ এবং মদিনার ওপর কোনো বহিরাগত আক্রমণ হলে সকল গোত্রের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা করা হয়।

মদিনা সনদের মাধ্যমে মহানবী (সা.) বিভিন্ন গোত্রকে একটি সুদৃঢ় ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ করেছিলেন। ইসলামের ভিত্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে এই সনদ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একে ঐতিহাসিক বিজয়ও বলা যায়।

মদিনা সনদের ধারাবাহিকতায় বদর, উহুদ ও খন্দকের মতো যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই সনদের ফলে মুসলমানরা যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা লাভ করেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় মক্কার কুরাইশদের বিরুদ্ধে বদরের যুদ্ধে তারা অংশগ্রহণ করে এবং বিজয় অর্জন করে।

ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য মহানবী (সা.)-কে অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে—এটি সত্য। তবে কোনো যুদ্ধেই মুসলমানরা প্রথম আক্রমণকারী ছিল না।

বদরের যুদ্ধ: ইসলামের প্রথম বড় সামরিক বিজয়

মদিনার কোনো ব্যক্তি মক্কায় হজ করতে গেলে মক্কার কুরাইশরা প্রায়ই বাধা প্রদান করত। আবার মদিনার মুসলমানরা মদিনার সীমান্তে উট ও দুম্বা চরাতে নিয়ে গেলে কুরাইশরা আক্রমণ করে সেগুলো নিয়ে যেত। এসব আক্রমণের প্রতিরোধ করার মতো শক্তি ও সাহস মুসলমানদের মধ্যে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল।

মহানবী (সা.) যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি জুহায়না ও বনু জামারার মতো কয়েকটি সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরেও আগ্রহী ছিলেন। পক্ষান্তরে কুরাইশরা কোনো ধরনের শান্তিচুক্তিতে আগ্রহী না হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে।

কুরাইশদের আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) মুসলমানদের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি অভিযান পরিচালনার জন্য পাঠান। ওয়াদ্দান, বুয়াত, সাফওয়ান, যুল উশায়রা এবং আবদুল্লাহ ইবন জাহশের নেতৃত্বাধীন অভিযান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এর মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন জাহশের নেতৃত্বাধীন নাখলা অভিযানে কুরাইশ নেতা আমর ইবন হাযরামি নিহত হলে মক্কার কুরাইশরা ভীষণভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এর ফলেই ইসলামের প্রথম বড় যুদ্ধ হিসেবে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

এই যুদ্ধে মুসলমানদের মাত্র ১৪ জন শাহাদাত বরণ করেন। পক্ষান্তরে কুরাইশদের ৭০ জন নিহত এবং ৭০ জন বন্দি হয়। বদরের যুদ্ধে কুরাইশরা মুসলমানদের সামরিক শক্তি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভ করে। এর পর থেকেই মুসলমানদের প্রতি তাদের ভয় বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং নতুনভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে শুরু করে।

উহুদের যুদ্ধ ও মুসলমানদের শিক্ষা

বদরের যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ফলাফলে মুসলমানদের অবস্থান দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোত্র মুসলমানদের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে, যা কুরাইশদের জন্য ছিল অসহনীয়।

বদরে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কুরাইশরা মক্কার বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু বদরে তাদের বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মৃত্যুর কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্তি নিয়ে দাঁড়ানোর মতো আত্মবিশ্বাস তাদের ছিল না।

দীর্ঘ এক বছর ধরে প্রচার-প্রচারণা ও শক্তি সঞ্চয়ের পর তৃতীয় হিজরিতে তারা উহুদের যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হয়। প্রায় তিন হাজার দক্ষ ও নির্বাচিত সৈন্য এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম নিয়ে কুরাইশরা মদিনার দিকে অগ্রসর হয়। অপরদিকে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র সাতশ এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্রও ছিল নিম্নমানের।

যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে মুসলমানরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও মহানবী (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করে উহুদ পর্বতের পাহারাদার সাহাবিদের একটি অংশ গনিমতের মাল সংগ্রহের চেষ্টা করলে শৃঙ্খলার ভাঙন সৃষ্টি হয়। কুরাইশরা সেই সুযোগে আক্রমণ চালায় এবং মুসলমানদের বিজয় পরাজয়ে পরিণত হয়। মুহূর্তের মধ্যে মুসলমানদের সত্তরজন সাহাবি শাহাদাত বরণ করেন।

উহুদের যুদ্ধ মুসলমানদের যে শিক্ষা দিয়েছিল, পরবর্তী প্রতিটি পদক্ষেপে তারা সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়েছে। কুরাইশরা উহুদে বিজয় লাভ করলেও মুসলমানদের ব্যাপক ক্ষতি করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা তা কাজে লাগাতে পারেনি এবং উহুদ প্রান্তর ছেড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।

মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান শক্তি

এভাবেই ধীরে ধীরে মুসলমানদের অবস্থান শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ডব্লিউ. মন্টগোমারি ওয়াট লিখেছেন যে, যুদ্ধের সামরিক ফলাফল মহানবী (সা.)-এর জন্য পুরোপুরি সন্তোষজনক না হলেও তিনি মক্কার কুরাইশ বাহিনীর প্রায় সমপর্যায়ের একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মুসলমানদের দারিদ্র্যের কারণে অশ্বারোহী বাহিনী গঠন করা সম্ভব ছিল না। বিপরীতে কুরাইশদের অশ্বারোহী বাহিনী ছিল। ফলে মুসলমানদের ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মহানবী (সা.) মক্কার কুরাইশদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান সুসংহত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আতাহার হোসেন তাঁর Prophet Muhammad and his Mission গ্রন্থে লিখেছেন, মক্কার কুরাইশরা বুঝতে পেরেছিল যে, তাদের একক শক্তির মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ফলে ক্রোধ ও ক্ষোভ নিয়ে তারা মুসলমানদের ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেও একপর্যায়ে তারা উপলব্ধি করতে বাধ্য হয় যে, অদূর ভবিষ্যতে মুসলমানদের সঙ্গে সমঝোতা করেই চলতে হবে।

খন্দকের যুদ্ধ: কুরাইশদের শেষ বড় আক্রমণ

যুদ্ধে সুবিধা করতে না পেরে কুরাইশরা বিভিন্নমুখী ষড়যন্ত্র ও অপকৌশলের মাধ্যমে মুসলমানদের পরাস্ত করার পথ খুঁজতে থাকে। ইহুদিদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে তারা মহানবী (সা.)-কে হত্যার পরিকল্পনাও করেছিল।

দ্বিতীয় বদর অভিযানে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। দুমাতুল জান্দালে মুসলমানদের অভিযানে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়। এভাবে একের পর এক পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় কুরাইশরা চরম হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত হয়।

অবশেষে তারা অতর্কিতভাবে মদিনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। মদিনায় ষড়যন্ত্রকারী ইহুদি ও মুনাফিকদের যোগসাজশে তারা পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়। মহানবী (সা.)-এর কাছে তাদের ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস হয়ে যায়। ফলে তিনি সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভা আহ্বান করেন।

পারস্যের সাহাবি সালমান ফারসি (রা.) পরিখা খননের পরামর্শ দেন। মহানবী (সা.) সেই পরামর্শ গ্রহণ করেন। পঞ্চম হিজরিতে সংঘটিত এই যুদ্ধকে খন্দকের যুদ্ধ বা পরিখার যুদ্ধ বলা হয়।

খন্দকের যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সর্ববৃহৎ সামরিক অভিযান। কিন্তু সবদিক থেকে চেষ্টা করেও তারা মুসলমানদের ধ্বংস করতে সক্ষম হয়নি। প্রায় তিন হাজার মুসলমান নারী, শিশু ও পুরুষের বিপরীতে কুরাইশরা প্রায় দশ হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনা আক্রমণ করেও সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

প্রায় এক মাস মুসলমানদের অবরোধের পর কুরাইশরা পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। এর মাধ্যমে মদিনার বিরুদ্ধে কুরাইশদের বৃহৎ আকারের সামরিক অভিযান কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

মহানবী (সা.)-এর শান্তিনীতির আদর্শ

মূলত শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল মহানবী (সা.)-এর আদর্শ। তবে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়লে বৃহত্তর শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই তিনি যুদ্ধ করেছেন।

পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে যতক্ষণ না অশান্তি দূর হয়। আবার কোনো পক্ষ শান্তিচুক্তির প্রস্তাব দিলে তা গ্রহণ করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলা হয়েছে।

পবিত্র কুরআনের নির্দেশ অনুসারে মহানবী (সা.) সবসময় শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। শত্রুর পক্ষ থেকে আক্রমণ না হলে তিনি কখনো যুদ্ধের অনুমতি দেননি। যুদ্ধের পূর্বে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনাও তিনি যাচাই করে দেখতেন।

এই নীতিরই এক অনন্য প্রকাশ হলো হুদায়বিয়ার সন্ধি।

হুদায়বিয়ার সন্ধির পটভূমি

দীর্ঘদিন মাতৃভূমি মক্কা থেকে দূরে থাকার পর মহানবী (সা.)-এর হৃদয় মক্কার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। কাবা শরিফ জিয়ারত করার মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ইঙ্গিতের ভিত্তিতে মহানবী (সা.) ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে পবিত্র উমরাহ পালনের সিদ্ধান্ত নেন।

এই উদ্দেশ্যে মহানবী (সা.) তাঁর প্রায় চৌদ্দশ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে উমরাহ সম্পন্ন করার জন্য মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে মক্কার কুরাইশদের শত্রুতা তখনও শেষ হয়নি। তারা মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ ঠেকানোর জন্য প্রস্তুতি নেয়। খুযায়া গোত্রের সর্দার বুদাইলের মাধ্যমে মহানবী (সা.) জানতে পারেন যে, কুরাইশরা মুসলমানদের প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত।

মহানবী (সা.) বুদাইলের মাধ্যমে কুরাইশদের জানিয়ে দেন যে, মুসলমানরা কোনো যুদ্ধের উদ্দেশ্যে নয়; বরং শান্তিপূর্ণভাবে কাবা শরিফে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যেই মক্কার দিকে যাচ্ছে।

এই সংবাদ পাওয়ার পর কুরাইশদের কিছু বিচক্ষণ ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর শান্তিপূর্ণ প্রস্তাব গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়। তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মহানবী (সা.)-কে উমরাহ পালন করতে না দিলে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। তাছাড়া মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে কুরাইশরা সিরিয়ার সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কও পুনরায় চালু করতে পারবে। কারণ মদিনার ওপর দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যপথটি তখন মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

এই পরিস্থিতিতে কুরাইশরা তাদের মুখপাত্র হিসেবে উরওয়া ইবন মাসউদকে মহানবী (সা.)-এর কাছে পাঠায়।

উরওয়া মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে আলোচনায় বসেন। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর অনুসারীদের প্রতি তাঁর অপ্রীতিকর ও শত্রুভাবাপন্ন মনোভাবের কারণে আলোচনা সফল হয়নি। তবে মহানবী (সা.)-এর প্রতি সাহাবিদের গভীর ভক্তি, ভালোবাসা ও আস্থা দেখে উরওয়া বিস্মিত হন। মক্কায় ফিরে গিয়ে তিনি কুরাইশদের সেই বিষয়টি অবহিত করেন।

পরবর্তীতে মহানবী (সা.) দ্বিতীয়বারের মতো কুরাইশদের কাছে খিরাশ ইবন উমাইয়া নামের একজন দূতকে পাঠান। কিন্তু কুরাইশরা তাঁর সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করে এবং তাঁর উটের পায়ের রগ কেটে দেয়। একই সঙ্গে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরও শত্রুতামূলক আচরণ শুরু করে।

অবশেষে মহানবী (সা.) হযরত উসমান (রা.)-কে শান্তির বার্তা নিয়ে মক্কার কুরাইশদের কাছে পাঠান। হযরত উসমান (রা.) মক্কায় পৌঁছালে কুরাইশরা তাঁকে বন্দি করে।

মুসলিম শিবিরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, কুরাইশরা হযরত উসমান (রা.)-কে হত্যা করেছে। মহানবী (সা.) এই সংবাদে গভীরভাবে মর্মাহত হন। পবিত্র কাবা শরিফের এলাকায় কোনো আরব গোত্রপ্রধানকে হত্যা করা ইসলামপূর্ব আরবদের কাছেও অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতো।

বাইয়াতুর রিদওয়ান

মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবিদের ডেকে নতুন করে শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁরা ঘোষণা করেন যে, তাঁদের ধর্ম ও ঈমানের জন্য শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করবেন। একটি গাছের নিচে এই শপথ গ্রহণ করা হয়। ইতিহাসে এটি ‘বাইয়াতুর রিদওয়ান’ নামে পরিচিত।

পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, মুমিনরা যখন গাছের নিচে মহানবী (সা.)-এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল, তখন আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁদের অন্তরের অবস্থা তিনি জানতেন এবং তাঁদের ওপর প্রশান্তি নাজিল করেছিলেন। তাঁদের আসন্ন বিজয়ের সুসংবাদও প্রদান করা হয়েছিল।

সকল সাহাবির শপথ গ্রহণ শেষ হলে মহানবী (সা.) তাঁর ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখে হযরত উসমান (রা.)-এর পক্ষ থেকেও নিজেই শপথ গ্রহণ করেন। পরে অবশ্য হযরত উসমান (রা.) নিরাপদে মুসলিম শিবিরে ফিরে আসেন।

হুদায়বিয়ার সন্ধি

কুরাইশরা বুঝতে পারল যে, এই ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুসলিম দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সফল হওয়া সহজ হবে না। তাদের অতীতের পরাজয় ও ক্ষয়ক্ষতির স্মৃতিও তখনো তাজা ছিল। ফলে তারা সুহাইল ইবন আমরকে মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধি করার জন্য দূত হিসেবে পাঠায়।

দুই পক্ষের আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে অবশেষে একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। ইতিহাসে এটিই ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত।

হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রধান শর্তগুলো ছিল নিম্নরূপ:

*    এ বছর মুসলমানরা পবিত্র কাবায় উমরাহ পালন না করেই মদিনায় ফিরে যাবে।

*     পরের বছর মুসলমানরা উমরাহ করতে পারবে; তবে তিন দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না।

*     মুসলমানরা পরবর্তী বছর কোনো যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া মক্কায় প্রবেশ করবে। কেবল খাপবদ্ধ তরবারি সঙ্গে রাখা যাবে।

*     মক্কায় বসবাসকারী কোনো মুসলমানকে কুরাইশরা সঙ্গে করে মদিনায় নিয়ে যেতে পারবে না। আবার কোনো মুসলমান মক্কায় যেতে চাইলে কুরাইশরা তাকে বাধা দিতে পারবে না।

*     কোনো মক্কাবাসী মদিনায় চলে গেলে তাকে হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু কোনো মুসলমান মক্কায় চলে গেলে মক্কাবাসীরা তাকে হস্তান্তর করবে না।

*     আরবের অন্যান্য গোত্র স্বাধীনভাবে যে কোনো পক্ষের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে।

*     এই চুক্তির মেয়াদ হবে দশ বছর।


হুদায়বিয়ার সন্ধি: আপাত অপমান, প্রকৃত বিজয়

সাধারণভাবে মুসলমানরা এই শর্তগুলোতে খুশি হতে পারেনি। চুক্তির শর্তগুলো প্রথম দৃষ্টিতে একতরফা ও অপমানজনক মনে হয়েছিল। চুক্তিপত্র রচনার সময়ও উভয় পক্ষ স্বাক্ষর না করা পর্যন্ত নানা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

এ সময় কুরাইশদের পক্ষে সন্ধির শর্ত নির্ধারণকারী সুহাইল ইবন আমরের পুত্র আবু জান্দাল মুসলমানদের শিবিরে এসে উপস্থিত হন। তিনি ইতোমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং ইসলামের কারণে কুরাইশদের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

আবু জান্দাল তাঁর ওপর সংঘটিত নির্যাতনের চিহ্ন মহানবী (সা.)-কে দেখান। তাঁর অবস্থা দেখে মহানবী (সা.) এবং সাহাবিরা অত্যন্ত ব্যথিত হন। আবু জান্দালের আকুল আবেদনে মহানবী (সা.)-এর হৃদয় বিগলিত হলেও তিনি চুক্তির শর্ত ভঙ্গকারী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

তিনি আবু জান্দালকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেন এবং নিজে চুক্তির শর্ত পালনে দৃঢ় থাকেন। হযরত উমর (রা.), হযরত আলী (রা.)-সহ অনেক সাহাবি এ ঘটনায় গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং চুক্তির শর্তগুলোকে অত্যন্ত অপমানজনক মনে করেছিলেন।

কিন্তু মহানবী (সা.) পরিস্থিতির গভীরতা ও ভবিষ্যৎ ফলাফল সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন।

হুদায়বিয়ার সন্ধির রাজনৈতিক গুরুত্ব

মহানবী (সা.)-এর রিসালাত ও বিশাল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। কারণ এটি ছিল মক্কার নেতৃত্বস্থানীয় কাফিরদের পক্ষ থেকে মদিনায় প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বের স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

প্রাণের শত্রু ছিল, তারাই সন্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ দশ বছর যুদ্ধ-বিগ্রহ না করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলো। এই চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর ঘর কাবা শরিফ জিয়ারতের অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর মহানবী (সা.) ইসলামের দাওয়াত দেশ-বিদেশে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পান। ফলে ইসলামের প্রচার ও বিস্তার দ্রুততর হয়।

এই সন্ধির পরপরই খালিদ ইবন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস ও উসমান ইবন তালহাসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

প্রথম দৃষ্টিতে সন্ধির ধারাগুলো মুসলমানদের জন্য অসম্মানজনক মনে হলেও বাস্তবে এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। অল্প সময়ের মধ্যেই মদিনার বাইরের বিভিন্ন গোত্রের অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে।

সন্ধির একটি শর্ত অনুযায়ী মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তনকারী নবদীক্ষিত মুসলমানদের মহানবী (সা.) মক্কায় পাঠিয়ে দিতেন। আবু জান্দাল ছিলেন এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

পরবর্তীতে এসব নবদীক্ষিত মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে গেলে তাঁরা মদিনায় না গিয়ে সমুদ্রতীরবর্তী ‘ঈস’নামক একটি জঙ্গলে বসবাস শুরু করেন। সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনকারী মক্কার ব্যবসায়ীদের সেই পথ দিয়ে আসতে হতো। ফলে তাঁরা এসব নবদীক্ষিত মুসলমানকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করতে শুরু করে এবং নিজেরাই চুক্তির ওই শর্ত পরিবর্তনের অনুরোধ জানায়।

এর ফলে এসব নবদীক্ষিত মুসলমান আবার মদিনায় মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। এভাবেই দেখা যায়, চুক্তির যে শর্তগুলো প্রথমে মুসলমানদের জন্য অপমানজনক মনে হয়েছিল, বাস্তবে তার সুফলই শেষ পর্যন্ত মুসলমানরা লাভ করে।

হুদায়বিয়ার সন্ধি থেকে মক্কা বিজয়

হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে মুসলিম মিল্লাত আরব বিশ্বে একটি শক্তিধর জাতি হিসেবে সম্মান লাভ করে। মহানবী (সা.) অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মক্কার কাফিরদের প্রতিনিধি সুহাইল ইবন আমরের আরোপিত শর্তগুলো মেনে নিয়েছিলেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে ‘ফাতহুম মুবিন’ বা ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এই মহান সন্ধির ধারাবাহিকতায় ইসলামের উত্তরোত্তর প্রসার ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয় সম্পন্ন হয়। ফলে হুদায়বিয়ার সন্ধি শুধু একটি যুদ্ধবিরতি ছিল না; এটি ছিল মক্কা বিজয়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি।

সন্ধি ভঙ্গ ও মক্কা বিজয়ের পথ

হুদায়বিয়ার সন্ধি দুই বছর স্থায়ী হয়। এই দুই বছরে ইসলাম অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সন্ধি কার্যকর হওয়ার পর খুযায়া গোত্র মুসলমানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে। অপরদিকে মুসলমানদের শত্রু বনু বকর কুরাইশদের সঙ্গে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হয়।

মুসলমানদের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় কুরাইশদের অন্তর্জ্বালা ও ক্রোধ আরও বাড়তে থাকে। খুযায়া গোত্র মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ায় কুরাইশরা তাদের মিত্র বনু বকরকে খুযায়া গোত্র আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করতে থাকে।

এই গোপন ষড়যন্ত্রের ফলে এক রাতে খুযায়াবাসী যখন ‘ওয়াতির’ নামক জলাশয়ের নিকট ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল, তখন বনু বকর অতর্কিতভাবে তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। খুযায়া গোত্রের বহু লোক নিহত হয় এবং তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়। কুরাইশরা এই আক্রমণে প্রকাশ্যে সহযোগিতা করে।

খুযায়া গোত্র এই নির্মমতার বিরুদ্ধে কুরাইশদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পায়নি। অবশেষে তারা মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে নিজেদের রক্ষার জন্য একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর আবেদন জানায়।

মহানবী (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্তের যে কোনো একটি গ্রহণ করার বার্তা পাঠান:

১. খুযায়া গোত্রের যেসব মানুষ নিহত হয়েছে, কুরাইশদের তাদের রক্তপণ প্রদান করতে হবে;

২. বনু বকরের সঙ্গে কুরাইশদের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে;

৩. অথবা কুরাইশদের হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল ঘোষণা করতে হবে।

কুরাইশরা প্রথম দুটি শর্ত গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এবং কুরত ইবন উমরের মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর কাছে সংবাদ পাঠায় যে, তারা তৃতীয় শর্তটি গ্রহণ করেছে।

এটি ছিল কুরাইশদের জন্য অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত। কারণ তারা তখনো বুঝতে পারেনি যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল করার অর্থ হলো মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধের পথ খুলে দেওয়া।

পরবর্তীতে আবু সুফিয়ান সন্ধিচুক্তি নবায়নের উদ্দেশ্যে নিজেই মদিনায় মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। কিন্তু তাঁর প্রস্তাবের প্রতি মুসলমানদের দাবির কোনো গুরুত্ব তিনি দেননি। ফলে মহানবী (সা.) তাঁর চুক্তি নবায়নের প্রস্তাবে সম্মত হননি।

মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি

মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ গোপন রেখে মহানবী (সা.) অষ্টম হিজরির ১০ রমজান দশ হাজার সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মক্কার কুরাইশদের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য মদিনা ত্যাগ করেন।

পথিমধ্যে ‘মারউজ্জাহরান’ নামক স্থানে তিনি শিবির স্থাপন করেন। বিশাল মুসলিম বাহিনী দেখে কুরাইশরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। প্রত্যেক তাঁবুতে আগুন জ্বালানোর জন্য মহানবী (সা.) নির্দেশ দেন। রাতের সেই দৃশ্য দেখে কুরাইশরা মুসলিম বাহিনীর প্রকৃত শক্তি সম্পর্কে ধারণা করতে বাধ্য হয়।

এ সময় আবু সুফিয়ান ছদ্মবেশে মুসলিম শিবিরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে এসে ইসলামের সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন। তাঁকে মহানবী (সা.)-এর কাছে নিয়ে আসা হয়।

মহানবী (সা.) তাঁর প্রতি দয়া প্রদর্শন করেন এবং ঘোষণা করেন যে, যারা আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করবে, তারা নিরাপদ থাকবে।

মহানবী (সা.)-এর মহানুভবতা এবং ইসলামের উদার নীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরবর্তীতে আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় ফিরে গিয়ে তিনি মুসলমানদের আগমন এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার পরিণতি সম্পর্কে কুরাইশদের সতর্ক করে দেন।

মক্কা বিজয়: ক্ষমা ও মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত

পরদিন মহানবী (সা.) শান্তিপূর্ণভাবে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং কোনো ধরনের রক্তপাত থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে নির্দেশ দেন।

তিনি পবিত্র কাবা শরিফে প্রবেশ করে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কাবাঘর থেকে সব প্রতিমা অপসারণ করা হয় এবং কাবাঘরকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করা হয়।

এরপর মহানবী (সা.) এক ভাষণে মক্কাবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।

এভাবেই মহানবী (সা.) তাঁর শত্রুদের প্রতি ক্ষমার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে তিনি এবং তাঁর সাহাবিরা মক্কার কুরাইশদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁদের নির্যাতনের কারণেই মুসলমানদের মদিনায় হিজরত করতে হয়েছিল।

তবুও মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.) প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। হিন্দা, আবু সুফিয়ানসহ ইসলামের ঘোরতর বিরোধীদেরও তিনি ক্ষমা করে দেন।

ইতিহাসে কোনো বিজয়ী শত্রুদের প্রতি এভাবে ভালোবাসা, ক্ষমা ও দয়া প্রদর্শন করেছেন—এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন।

মক্কা বিজয় তাই শুধু একটি সামরিক বিজয় নয়; এটি ছিল ইসলামের নৈতিক, মানবিক ও ধর্মীয় আদর্শের বিজয়।

হুদায়বিয়ার সন্ধি: মক্কা বিজয়ের বীজ

ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের অনেকেই স্বীকার করেছেন যে, যুদ্ধ বিজয়ের পর বিজয়ীর বেশে মহানবী (সা.)-এর মক্কা নগরীতে প্রবেশের দৃশ্যের মতো দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।

বিশ্ব ইতিহাস মহানবী (সা.)-এর মতো এমন ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করতে পারেনি, যাঁর মধ্যে ছিল শত্রুকে ক্ষমা করার এমন অসাধারণ শক্তি এবং মানবতার প্রতি এমন গভীর মমত্ববোধ।

প্রকৃতপক্ষে মক্কা বিজয় ছিল ইসলামের এক অনন্য বিজয় এবং মহানবী (সা.)-এর পবিত্র ধর্মীয় আদর্শ ও অবিচল বিশ্বাসের বিজয়।

হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল ইসলামের জন্য এক সুদূরপ্রসারী বিজয়। মহানবী (সা.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক এই সন্ধির মাধ্যমেই মূলত মক্কা বিজয়ের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়।

খালিদ ইবন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস ও উসমান ইবন তালহাসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এই সময় ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর ইসলামের প্রচার ও প্রসারের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তা অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলমানদের শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করে।

হিজরতের অল্প কয়েক বছর আগেও মুসলমানদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু হুদায়বিয়ার সন্ধির মাত্র দুই বছর পর মহানবী (সা.) দশ হাজার সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মক্কা বিজয় করেন। এই পরিবর্তনই হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রকৃত ফলাফলকে স্পষ্ট করে।

ঐতিহাসিক হিউমের ভাষায়, মূর্তিপূজকদের মধ্যে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন এমন কোনো মানুষ ছিল না, যিনি এই সন্ধির ফলে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হননি।

বাস্তবিক অর্থে হুদায়বিয়ার সন্ধির মধ্যেই মক্কা বিজয়ের বীজ নিহিত ছিল। এই সন্ধি হঠাৎ করে একদিনে সৃষ্টি হয়নি। মহানবী (সা.)-কে নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে কুরাইশরা একপর্যায়ে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করেছিল। হিজরতের পরও তারা মহানবী (সা.) ও ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে।

বদর, উহুদ ও খন্দকের মতো যুদ্ধও তারা মহানবী (সা.) ও ইসলামকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই সংঘটিত করেছিল। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সহযোগিতা পেয়েও তারা মুসলমানদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি।

একপর্যায়ে তাদের সেই কুরাইশদেরই মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে হুদায়বিয়ার সন্ধিতে বসতে হয়।

এই সন্ধির সুযোগে মহানবী (সা.) দেশ-বিদেশে ইসলামের আহ্বান পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। মাত্র দুই বছরের মধ্যে সন্ধির সুফলে মুসলমানদের শক্তি ও সাফল্য এত ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় যে, কুরাইশদের সামনে সন্ধি ভঙ্গ করা ছাড়া আর কোনো পথ অবশিষ্ট থাকেনি।

কুরাইশরা যখন হুদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গ করল, তখন মহানবী (সা.) দশ হাজার মুসলিম সৈন্য নিয়ে মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন। মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়েই শুরু হলো ইসলামের বিশ্বজয়ের নতুন অধ্যায়।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা হুদায়বিয়ার সন্ধিকে ‘ফাতহুম মুবিন’ বা ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইতিহাসের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, এই ‘সুস্পষ্ট বিজয়’-এর ধারাবাহিক ফলই ছিল ইসলামের দ্রুত বিস্তার এবং অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়।

হুদায়বিয়ার সন্ধি তাই শুধু একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির দলিল নয়; এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, ধৈর্য, শান্তিনীতি ও কূটনৈতিক সাফল্যের এক অনন্য দলিল। আপাতদৃষ্টিতে যে সন্ধি মুসলমানদের জন্য কঠিন ও অপমানজনক মনে হয়েছিল, ইতিহাসের বিচারে সেটিই পরিণত হয়েছিল ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজয়ের ভিত্তিতে।

গ্রন্থপঞ্জি

১. ইবনে হিশাম, সীরাতে ইবনে হিশাম, আকরাম ফারুক অনূদিত, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা, ১৯৮৮।

২. আল্লামা শিবলী নোমানী, সিরাতুন নবী (সা.), আল্লামা সোলায়মান নদভী ও মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত, প্যারাডাইস লাইব্রেরি, ঢাকা, ১৯৭৫।

৩. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা, ১৯৮০।

৪. আ.ল.মু. ইয়াকুব আলী, মহানবী ও ইসলাম, রেজা-উর-রহীম মতিহার, রাজশাহী, ১৯৭৪।

৫. শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোসাইন ও ড. এ.এইচ.এম. মুজতবা হোসাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.), সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ, ১৯৯৮।

৬. ইবনে ইসহাক, শহীদ আখন্দ অনূদিত, সীরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.), তৃতীয় খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯২।

৭. আল্লামা সফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, খাদিজা আখতার রেজায়ী অনূদিত, পরিবেশনা—আল কোরআন একাডেমি লন্ডন, বাংলাদেশ কার্যালয়, চতুর্থ প্রকাশ, ২০০০।

৮. ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, ইসলামের ইতিহাস, গ্লোব লাইব্রেরি (প্রা.) লিমিটেড, ঢাকা, ১৯৭৫।

৯. ড. মজিদ আলী খান, শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.), আবু মুহাম্মদ অনূদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০৫।

১০. মুহাম্মদ আবু তাহের (সম্পাদিত), রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হুদায়বিয়ার সন্ধি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০৭।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ঝরোকা পরিবারে আপনাকে স্বাগতম! অনুগ্রহ করে গঠনমূলক ও মার্জিত মন্তব্য করুন।;

comment url