কাজী নজরুল ইসলাম এবং রাজশাহী কলেজ শতবর্ষের স্মৃতি

কাজী নজরুল ইসলাম এবং রাজশাহী কলেজ শতবর্ষের স্মৃতি 

১৯২৮ সালে কাজী নজরুল ইসলামের ঐতিহাসিক রাজশাহী সফর, 'দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাব' প্রতিষ্ঠা এবং রাজশাহী কলেজের স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস জানুন এই পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধে।



বাঙালি সংস্কৃতির নবজাগরণমুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তারে উত্তরবঙ্গের প্রাচীন শিক্ষানগরী রাজশাহীর অবদান ঐতিহাসিক। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে এ অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরে এক মোড়ঘোরানো অধ্যায়ের সূচনা হয় ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে।


তৎকালীন অনগ্রসর মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষাগার আলোকিত গ্রন্থাকারে সর্বসাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের তিন দিনের রাজশাহী সফর এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। এই সফরের কেন্দ্রে ছিল নবপ্রতিষ্ঠিত ‘দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাব’ এবং ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজ।

পটভূমি: রাজশাহী মুসলিম ক্লাব প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট

বিংশ শতাব্দীর সূচনায় রাজশাহী শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেশ কিছু পাঠাগার ও সেবা সংস্থা গড়ে উঠলেও সাধারণ মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রবেশাধিকার সেখানে অত্যন্ত সীমিত ছিল। মিঞাপাড়া মহল্লায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী 'রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাকার'-এ তৎকালীন সময়ে সাধারণ মুসলমানদের সদস্য হওয়া বা প্রবেশের অধিকার ছিল না। ১৯২৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জনৈক মুসলিম অ্যাডভোকেট বহু বাধা অতিক্রম করে এর সদস্যপদ লাভ করলেও সাধারণ মুসলমানদের জন্য দ্বার অবরুদ্ধই থেকে যায়।

একইভাবেতৎকালীন অত্যন্ত জনপ্রিয় সংস্থা ‘রাজশাহী সমাজ সেবক সংঘ’, যা স্বামী বিবেকানন্দের ‘জীব সেবা-ই শিব সেবা’ আদর্শে তরুণদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কর্তৃক উন্মোচিত হয়েছিল, সেখানেও মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল সীমাবদ্ধ।

এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরের এক শীতের সন্ধ্যায় অধ্যাপক উমদাতুল ইসলামের বাসায় রাজশাহীর বিশিষ্ট মুসলিম গুণীজনেরা জরুরি বৈঠকে বসেন। পরবর্তীতে সেশন জজ টি. আই. এম. নূর-উন-নবী চৌধুরী আইসিএস-এর বাসায় দ্বিতীয় বৈঠকে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উপস্থিত মুন্সেফ ওবায়দুস সোবহানশেখ শরফুদ্দীনসিরাজুল ইসলামখোদাবখশ মৃধার পিতা কছির উদ্দিন মৃধাআজিজুল আলমসহ প্রবীণ ও তরুণ কর্মীদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ‘দি রাজশাহী মুসলিম ক্লাব’ গঠনের প্রস্তাব পাস হয়। ক্লাবের স্থান নির্ধারণ করা হয় হোসেনীগঞ্জে এবং এর শুভ উদ্বোধনের জন্য সাময়িকভাবে কলকাতায় অবস্থানরত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত হয়।

রাজশাহীতে নজরুলের আগমন ও রাজকীয় অভ্যর্থনা

১৯২৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকালে দার্জিলিং মেইলে কলকাতা থেকে নাটোরে এসে পৌঁছান কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সিভিল সার্জন ড. মুনসুর রহমানমহসিন মিঞা ও কছিরুদ্দিন মৃধার আমন্ত্রণে সাঁড়া সাড়া সাড়ায় সাড়া দিয়ে কবি সেখানে আসেন। নাটোর স্টেশনে খান বাহাদুর এর প্রতিনিধি ও হাজী লাল মোহাম্মদ সরদারের পুত্রদের মোটর গাড়িতে কবিকে বরণ করে নেওয়া হয়। উল্লেখ্যট্রেন যাত্রায় পাবনার অধিবাসী ও পরবর্তীতে কবি বন্দে আলী মিঞা নজরুলের সফরসঙ্গী ছিলেন।

রাজশাহীতে পৌঁছে কবি প্রথমে কাদিরগঞ্জের 'বেলতলা ভবনে' আতিথ্য গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাঁকে হেতম খাঁ এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘চৌধুরী দালানে’ (ব্যারিস্টার আশরাফ আলী চৌধুরীর কাচারি বাড়িযা রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হতো) থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সাধারণ তরুণ ও ছাত্রদের সাথে মেসের মুক্ত পরিবেশে থাকতে পেরে কবি অত্যন্ত আনন্দিত হন।

হোসেনীগঞ্জের বিশাল জনসভা ও ঐতিহাসিক সংবর্ধনা

১৬ ডিসেম্বর বিকেলেই হোসেনীগঞ্জের মাঠে (বর্তমানে যেখানে টিবি ক্লিনিক অবস্থিত) কাজী নজরুল ইসলামকে সংবর্ধনা দিতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের ঢল নামে। জেলা জজ টি. আই. এম. নূর-উন-নবী চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। কবি মঞ্চে উঠে হারমোনিয়াম বাজিয়ে একের পর এক পরিবেশন করেন:

  • আমরা শক্তি আমরা বল আমরা ছাত্রদল
  • বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজ দোল
  • কামাল পাশা ও সাম্যের গান (আবৃত্তি)
  • দুর্গম গিরি কান্তার মরু
  • শৃঙ্খল পরা ছল মোদের এই শৃঙ্খল পরা ছল

অনুষ্ঠান চলাকালে রক্ষণশীল গোঁড়া সম্প্রদায়ের একাংশ গান বাজানোকে কেন্দ্র করে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করলেও মধ্যবিত্ত তরুণদের দৃঢ় হস্তক্ষেপে অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন হয়। সভা শেষে কবি 'রাজশাহী মুসলিম ক্লাব ও পাঠাগার'-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

রাজশাহী কলেজ ও নজরুলের ঐতিহাসিক সান্নিধ্য

১৬ ডিসেম্বর দুপুরেই রাজশাহী কলেজের ‘ফুলার মহামেডান হোস্টেলে’ (বর্তমান হোস্টেল ভবন) কলেজের মুসলিম শিক্ষার্থীরা কবিকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেন। উক্ত ভোজসভায় রাজশাহী কলেজের তৎকালীন শ্বেতাঙ্গ অধ্যক্ষ মি. টি. টি. উইলিয়ামস এবং আরবি বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরফুদ্দীন উপস্থিত ছিলেন।

১৭ ডিসেম্বর সকাল ৮টায় চৌধুরী দালান সংলগ্ন বিশাল বকুল বৃক্ষের নিচে অবস্থানরত রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে কবি নজরুল এক ঐতিহাসিক গ্রুপ ছবিতে অংশ নেন। অত্যন্ত সাদা-সিধে পোশাকে (ধুতিপাঞ্জাবি ও শাল পরিহিত) কবির সেই আলোকচিত্রটি আজও রাজশাহী কলেজের স্মারকগ্রন্থে অমূল্য ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষিত আছে।

১৮ ডিসেম্বর 'রাজা প্রমদানাথ টাউন হলে' বিকেলের বিশাল অধিবেশনে নজরুলকে পুনরায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এতে প্রায় ৬-৭ হাজার যুবক ও নারী উপস্থিত ছিলেন। এই জনসভার সবচেয়ে বিশেষ দিক ছিলস্বয়ং সাদা চামড়ার ইংরেজ অধ্যক্ষ মি. টি. টি. উইলিয়ামস এই সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন।

গুণীজনদের শ্রদ্ধা ও বিদায়

১৮ ডিসেম্বর সকালে নজরুল দর্শনশাস্ত্রবিদ ও 'গৌড় রাজমালা'র লেখক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়-এর সাথে তাঁর ঘোড়ামারার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। প্রবীণ এই ইতিহাসবিদ কবিকে গভীর কোলাকূলিতে আবদ্ধ করে আশীর্বাদ জানান। পরবর্তীতে কবি প্রাচীন স্বদেশী গানের স্রষ্টা কান্তকবি রজনীকান্ত সেন-এর স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন অতিক্রমকালে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং স্টিমার ঘাটের পথে নীরবে বিনম্র প্রণাম জানান।

১৯ ডিসেম্বর নজরুল তরুণ সমাজকে সত্যসততা ও প্রগতির পথে সংগ্রামের বার্তা দিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রাজশাহী ত্যাগ করেন।

ঐতিহাসিক তথ্যের সত্যতা ও সততা যাচাই (Fact-Checking & Transparency)

ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশের আগে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে নিচের ঐতিহাসিক সত্যতাগুলো জানা জরুরি:

  • সমর্থিত প্রামাণিক তথ্য: 
  • ১৯২৮ সালের ১৬-১৯ ডিসেম্বর নজরুলের রাজশাহী সফরহোসেনীগঞ্জের সংবর্ধনাসেশন জজের সভাপতিত্বফুলার হোস্টেলে মধ্যাহ্নভোজটি. টি. উইলিয়ামসের টাউন হলের সভায় সভাপতিত্ব এবং অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়ের সাথে সাক্ষাৎ, এগুলো তৎকালীন সাপ্তাহিক সওগাত (১৩ পৌষ ১৩৩৫ / ২৮ ডিসেম্বর ১৯২৮) এবং নজরুল চরিত (অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম) দ্বারা সম্পূর্ণ প্রমাণিত।
  • ঐতিহাসিক সংশোধন (সতর্কতা): 
  • মূল বর্ণনায় কবি রজনীকান্ত সেনের সাথে নজরুলের সরাসরি সংগীতালাপের যে উল্লেখ পাওয়া যায়তা ঐতিহাসিক কালানুক্রমের সাথে মেলে না। কান্তকবি রজনীকান্ত সেন ১৯১০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে ১৯২৮ সালে নজরুল কেবল তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ভিটা ও পুণ্যভূমির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।
  • জনসংখ্যা: 
  • হোসেনীগঞ্জের মাঠে ৪০,০০০ সমাগমের কথা বলা হলেও তৎকালীন পত্রিকা ও নথিমতে টাউন হল ও মাঠ মিলিয়ে বিশাল ৬-৭ হাজার মানুষের সরাসরি উপস্থিতি নথিভুক্ত আছে।

আরও বিস্তারিত তথ্যের উৎস ও রেফারেন্স (References for Further Reading)

এই বিষয়ে আরও গভীর তথ্য ও নথি সংগ্রহের জন্য নিচের উৎসগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে:

1.    নজরুল চরিত / নজরুল জীবনপঞ্জী – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম (বাংলা একাডেমি)।

2.    সাপ্তাহিক সওগাত – ১৩ পৌষ ১৩৩৫ (২৮ ডিসেম্বর ১৯২৮) সংখ্যা (বাংলা একাডেমি আর্কাইভ)।

3.    রাজশাহী কলেজের শতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ (১৮৭৩–১৯৭৩) – রাজশাহী কলেজ প্রকাশনা।

4.    রাজশাহীর পরিচিতি ও ইতিহাস – কাজী মোহাম্মদ মেসের।

5.    উত্তরবঙ্গে নজরুল – ড. আবদুল ওহাব।

6.    বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর (রাজশাহী) – ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও তৎকালীন রাজশাহী মুসলিম ক্লাবের সংরক্ষিত নথি।

 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ঝরোকা পরিবারে আপনাকে স্বাগতম! অনুগ্রহ করে গঠনমূলক ও মার্জিত মন্তব্য করুন।;

comment url